ভ্রমণ

কবিতার মুসাফির

ঈদ আনন্দ ২০১৮

বুলবুল সরওয়ার | ২৮ জুন ২০১৮, বৃহস্পতিবার
২০০৪-এ চরম তাড়াহুড়ার পর বেনাপোল-কলকাতা-দিল্লি হয়ে চন্ডিগড়ে ওয়ার্ল্ড রাইটার্স ফেস্টিভ্যালে আমন্ত্রিত ও পুরস্কৃত হই। ফেস্টিভ্যাল উদ্বোধিত হয় ন-টা ত্রিশে। আমি পৌঁছাই দেড়-ঘণ্টা পরে!
জানিনা, তারা কিভাবে আমাকে বাংলাদেশের সেরা তরুণ নির্বাচিত করেছিলেন, তবে শুনেছি বাংলাদেশ থেকে একটা প্রাথমিক বাছাই হয়েছিল ‘অন-লাইনে’। নির্বাচিতদের লেখা বাছাই করে কবি-নির্বাচন করেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং অন্নদাশংকর রায়। আমার কবিতা তখনো ইন্টারনেটে তেমন ছিল না। তিনটি বই তারা যোগাড় করেন ডাকযোগে পাঠান আর আমাকে রিকমেন্ড করেন আমেরিকান গবেষক ড. বেটি ব্লেয়ার এবং বাংলাদেশের কবি আল মাহমুদ। আর নেপথ্যে ছিলেন (সম্ভবত) ফজল ভাই (কবি ফজল শাহাবুদ্দীন)। ফাইনাল সিলেকশন পৌঁছায় বাউবি’র উপাচার্যের কাছেজ্জসেখানে যাতায়াত খরচের কোনো উল্লেখ ছিল না।
বাউবিশিসের সদস্য আনিসুর রহমান এবং রেজিস্ট্রার মনজুরে খুদা তরফদারের সুপারিশে তৎকালীন-ভিসি (মরহুম) ড. এরশাদুল বারী আমার যাতায়াতের সমস্ত খরচ ‘অগ্রীম’ দিয়ে একটি ব্রোশিওরও ছাপতে বলেন প্রকাশনা বিভাগকে। তারই কিছু গল্প।
ট্রেন থেকে নেমেই চমকে উঠলাম। এমন শহর আগে দেখিনি। কিভাবে যাবো? দুই বৃদ্ধ শিখ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলো: কাঁহা যায়গা, সাব?
‘মুসাফির’ অডিটোরিয়াম। বাট, ডোন্ট নো...।
কোই বাত নেহি, বেটা কোই বাত নেহি। উধার তো শায়েরি কা জবরদস্ত্‌ প্রোগ্রাম চল রাহা হ্যায়; ওহি যায়েগা?
হাঁ-জি। মাগার, মুঝে মালুম নেহি স্যার।
আমি জবাব দেবার আগেই পেছন থেকে এক চোস্ত ভদ্রলোক জবাব দিলেন: তো, চলো ভাই, হাম আপকো লে যায়েঙ্গে।
ভদ্রলোকের পরনে দামি থ্রি-পিস স্যুট, আধপাকা চুল; চোখে গোল্ডরীমের দামি চশমা। সঙ্গে এক শ্বেতাঙ্গিনী।
‘ওয়ার্ল্ড রাইটার্স ফেস্টিভ্যালে’ এসেছেন তো, চলুন। আমরাও যাচ্ছি। আমার নাম মোহন সিং পাঞ্জাবী; কিন্তু থাকি লন্ডনে। এ আমার বন্ধু কবি জ্যানেট লেভাল্লি।
হাউ ডু ইউ ডু, স্যার?
হাউ ডু ইউ ডু, জ্যানেট? নাইস টু মিট ইউ।
তুমি কত দূর থেকে জার্নি করে এলে?
ঢাকা থেকে। চেন তো ঢাকা। ছোট্ট বাংলাদেশের রাজধানী?
নিশ্চয়ই চিনি, সারোয়ার। আমি ইউরোপিয়ান হলেও গবেষণার কাজে শ্রীলঙ্কায় থাকি। প্রভু গৌতমের এক নগন্য সেবিকা আমি।
মোহন সিং তার গাড়িতে উঠিয়ে নিলো আমাদেরকে। তার হঠাৎ আতিথেয়তা এতই আন্তরিক যে আমি বিস্মিত হবারও সুযোগ পেলাম না।
শহরটি শুধু সুপরিকল্পিত নয়, বিস্ময়করও বটে। অসংখ্য ব্লক যা সেক্টর নামে পরিচিত। সেই ফটোকপি-মহল্লায় বিভক্ত চন্ডিগর। প্রতিটি সেক্টর দেখতে প্রায় একই রকম। খেয়াল করতেই বুঝলাম, প্রতিটি সেক্টরেই রয়েছে হাসপাতাল, খেলার মাঠ, মন্দির, পার্ক, বাজার এবং স্কুল। মানে প্রতিটি সেক্টরই স্বয়ংসম্পূর্ণ। উঁচু বাড়ি প্রায় নেই বললেই চলে। মেইন রোডগুলোতে দোকানপাট আছে। কিন্তু ভেতরের এলাকা পুরোপুরি আবাসিক। আমি অভিভূত হয়ে ভাবলাম: এই তো নেহেরুর সেই স্বপ্নপুরী, যাকে তিনি বলেছিলেন ‘আগামী-ভারতের সূর্যোদয়’।
মোহন সিং আমার বাউবি’র ব্রোশিউর দেখে বললেন: আপনি তাহলে কবি, ডাক্তার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক? ব্রাভো! এমন কম্বিনেশন এই প্রথম দেখলাম।
কেন স্যার, পৃথিবীর বেশিরভাগ কবি সাহিত্যিকই তো ভিন্ন ভিন্ন পেশার? তাতে কি কোনো সমস্যা?
না-না, সমস্যা নয়। তবে ডাক্তার শুনলেই ঘড়ির পেন্ডুলামের কথা মনে পড়ে তো তাই বললাম।
মানে?
মানে হলো, রোগী-ওষুধ-হাসপাতাল- এই পেন্ডুলাম।
আমার ব্রোশিউর নাড়াচাড়া করতে করতে ডক্টর জ্যানেট বললেন: বাট মোহন, বেঙ্গল তো গ্রেটদেরই জন্মস্থান। আপনার দেশে এখন শক্তিশালী কবি কে কে, বুলবুল?
আমি একটু দ্বিধায় পড়ে জবাব দেই: আমার মতে- আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ এবং ওমর আলী। আরো দু-জন সম্ভাবনায় কবির অকাল মৃত্যু আমাদেরকে তাদের মহান সৃষ্টি থেকে অকালে বঞ্চিত করেছে। আবুল হাসান এবং রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ।
হোয়াট অ্যাবাউট তাসলিমা নাসরিন, বুলবুল?
ও-হ্যাঁ, তিনিও বড় কবিজ্জতবে অতি মাত্রায় প্রান্তিকীয়।
প্রান্তিকীয় বলতে আপনি কি বুঝাচ্ছেন- এন্টি ফান্ডামেন্টালিস্ট নাকি এন্টি-এস্টাবলিশমেন্ট?
এর কোনটাই না। প্রান্তিকীয় বলতে আমি বুঝাতে চাইছি এক্সিট্রিমিস্ট। কবিদের হতে হয় নরম ভাষার অধিকারী, প্রেম হবে যাদের হাতিয়ার এবং ভালোবাসা হবে মাধ্যম। কিন্তু তাসলিমা দৃঢ় হাতে তুলে নিয়েছেন শুধুই বিদ্বেষ আর ঘৃণা। আপনি যদি নারীমুক্তির অন্যতম সংগঠক মেরী স্টোপসকেও দেখেন, যিনি অ্যাবরশনকে বৈধতা এনে দিয়েছেন জীবনব্যাপী সংগ্রামের মাধ্যমে তিনিও কি সেবাকেই বেছে নেননি প্রকাশের-মাধ্যম হিসেবে?
ও মাই গড ইউ আর অপোজিং হার? আর হউ এ ফান্ডামেন্টালিস্ট, বুলবুল?
যদি তুমি আমেরিকার রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডায় বিশ্বাসী হও, আই ডু নট; কিন্তু যদি উদারভাবে শব্দের গভীরে প্রবেশ করো, বলব: সার্টেনলি আই অ্যাম এ ফান্ডামেন্টালিস্ট।
কিভাবে?
একজন বড় কবির পরিচয় কি? মৌলিকতাই তো? এর মানেই তো ফান্ডামেন্টাল, নাকি? তোমার প্রভু-বুদ্ধ, কিংবা আমার-নবী মুহম্মদ, অথবা হিন্দুদের-শ্রীকৃষ্ণ বা খ্রিস্টানদের যিশু-খ্রিস্ট সবাই কি যার-যার মত ও বিশ্বাসে অটল নন? এমনকি মার্কসও কি তার দর্শনকে ভাবেন নি মেহনতী জনতার ‘একমাত্র মুক্তির পথ’? তাহলে বলো, মহান মানুষেরা কে ফান্ডামেন্টালিস্ট নয়?
বাট ইউ টরচার্টড হার? আই মিন তাসলিমা। ইজ ইন্ট?
শিয়োর। খ্রিস্ট, মুহম্মদ, শ্রীকৃষ্ণদের কেইবা টরচার্ড হননি মাই ডিয়ার জ্যানেট?
মোহন সিং হেসে বললো: হি ইজ ফ্রম দ্য কান্ট্রি অফ শেখ মুজিব অ্যান্ড রিবেল পোয়েট কাজী নজরুল ইসলাম। ডোন্ট আন্ডারএস্টিমেট হিম, জ্যানেট। পুরো ভারতের লোকে দুটো এলাকার মানুষকে  ডরায় সে এবং আমি। বুঝলে তো?
মানে, বেঙ্গল অ্যান্ড পাঞ্জাব, অ্যাম আই রাইট?
ইয়েস-ইয়েস, ফুললি রাইট, জ্যানেট। হাউ এভার, আমরা যাচ্ছি কোথায় জানো?
আমি মাথা নেড়ে বাইরে তাকালাম। ডাইনে একটি চমৎকার লেক আর বাঁয়ে সেই একই রকম মনোটোনাস বাড়ি-রাস্তা।
মোহন সিং বললো: চব্বিশ নম্বার সেক্টরে। জ্ঞানী গুরমুখ সিংহ মুসাফিরের সম্মানে নির্মিত আন্তর্জাতিক অডিটোরিয়ামে।
কে এই গুরমুখ সিং? ‘মুসাফির’ কি তার নাম না তখল্লুস?
মানে উপনাম? জ্যানেট প্রশ্ন করে।
ঠিক ধরেছেন কবি-বন্ধুরা।
তাহলে কি তিনি কোনো শিল্পী বা লেখক?
অবশ্যই। আধুনিক পাঞ্জাবের অন্যতম সেরা কবি তিনি। মুসাফির তার পেন-নেম। ব্যক্তিজীবনে ছিলেন ধর্মবেত্তা ও রাজনীতিবিদ। ‘স্বদেশী’ হয়ে জেল খেটেছেন বহুবার এবং শেষপর্যন্ত পাঞ্জাবের প্রথম মুখ্যমন্ত্রীরও সম্মান লাভ করেছেন।
ও-মাই-গড! জ্যানেট আঁতকে ওঠে। তোমাদের ইন্ডিয়া তো দেখি শুধু গ্রেট আর প্রতিভাবানদেরই জন্মভূমি, মোহন?
তো তার নামের আগে ‘জ্ঞানী, মানে কি, মোহনজী? আমি কৌতূহল চেপে রাখতে পারি না।
আমাদের একজন প্রেসিডেন্টও ছিলেন জ্ঞানী, জানেন তো? জ্ঞানী জৈল সিং। শুনে হয়তো হাসবেন, জ্ঞানীর মানে হলো ইংরেজিতে স্নাকতধারী। অথবা ধর্ম-বিষয়ে উচ্চতম চরিত্রাধিকারী। ঐ মৌলবীর মতো।
বাহ্‌- প্রথম জানলাম, স্যার।
আপনি আমাকে মোহন বলে ডাকুন, বুলবুল। বাঙালি কালচার অনুযায়ী মোহনদা ডাকলেও আমি মনে কিছু করবো না।
মাতৃভাষায় প্রশ্ন করলাম: বাংলাও জানেন নাকি, দাদা?
একটু আধটু। ভারতীয় প্রধান ভাষার সবগুলোই কমবেশি জানতে হয় প্রবাসে থাকতে গেলে। তবে চল্লিশ বছরেও দক্ষিণের কোনো ভাষাই আয়ত্তে আনতে পারিনি- এটাই দুঃখ থেকে গেল।
নেভার মাইন্ড সিং, জ্যানেট তাকে সান্ত্বনা দেয়: টেল আস সামথিং মোর অ্যাবাউট জিয়ানী মুসাফির।
জিয়ানী না, জ্ঞানী জ্যানেট।
আই কান্ট আটার ইট, সিং। এনি ওয়ে, এক্সিকিউজ মি।
জ্ঞানী মুসাফির পাঞ্জাবের লোক জন্ম হয়েছিল পাকিস্তান অংশে। স্কুল শেষ করার পর তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। অত্যন্ত সুদর্শন ছিলেন তিনি এবং সে রকমই মেধাবী ও দেশপ্রেমিক। জালিনওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের পর চাকরি ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে। জেল খাটেন। বেরিয়ে আবার লেখাপড়া শুরু করেন। গান্ধীজীর সত্যাগ্রহে যোগ দেন এবং বারবার জেলে যান। জেল থেকেই গ্র্যাজুয়েট হন তাই তার নাম হয় জ্ঞানী।
বাহ্‌।
ধর্মেও তিনি আস্থাবান ছিলেন। আকালী তখ্‌তের প্রধান হন একবার। শিখদের পঞ্চতীর্থের একটি গুরুদুয়ারার দায়িত্ব ছিলেন বেশ কিছুদিন। এরপর যোগ দেন কংগ্রেসে। প্রদেশ সভাপতি হন। নেহেরু ও গান্ধীর প্রিয়ভাজন হতেও সময় লাগে না। সাংসদ হন বেশ কয়েকবার। শেষপর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন নতুন-পাঞ্জাবের।
সো মাল্টিপারপাস ট্যালেন্ট, সিং?
ইয়েস, জ্যানেট। হি ওয়াজ লাইক দ্যাট ট্রিমেন্ডাস জিনিয়াস এন্ড প্যাট্রিয়ট। তার লেখা কবিতা পাঞ্জাবে খুবই জনপ্রিয়। গল্পেও তার পাকা হাত ছিল। তার কয়েকটি কাহিনী থেকে বলিউড সিনেমাও বানিয়েছে।
ওয়াও গ্রেট ম্যান!
তার নামের অডিটোরিয়ামেই এবারের ‘ওয়ার্ল্ড রাইটার্স ফেস্টিভ্যাল’ হচ্ছে যেখানে সারা বিশ্বের দশজন প্রবীণ এবং দশজন নবীন কবিকে সম্মানিত করা হচ্ছে।
রিয়েলী ওয়ান্ডারফুল! জ্যানেট উচ্চকন্ঠে প্রশংসা করে।
তরুণ কবিদের একজনের নাম শ্রীমতি জ্যানেট লিভাল্লি যদিও তিনি বয়সে তরুণ নন ফ্রম শ্রীলঙ্কা; আরেকজন ডা. বুলবুল সরওয়ার ফ্রম বাংলাদেশ।
ওয়াও কী সৌভাগ্য! আমরা পাশাপাশিই বসেছি। বলেই জ্যানেট হাত বাড়িয়ে দিলো আমার দিকে। আমি তার সঙ্গে হ্যান্ড শেক করলাম কোমলভাবে; কিন্তু তার আঙুলে আন্তরিক চাপ!
মাঝে-বসা মোহন সিং হাসতে হাসতে বললো ছাড়ো-ছাড়ো আর, তোমাদের মাঝে আছেন প্রবীণ পোয়েট এন্ড ট্রাস্টি, মোহন সিং, ফ্রম লন্ডন।
কথার মধ্যেই গাড়ি এসে দাঁড়ালো মুসাফির অডিটোরিয়ামের বারান্দায়। তাকিয়ে দেখি-রঙিন ফেস্টুন-ব্যানারে পুরো অডিটোরিয়াম ঝিলমিল করছে। প্রায় ঢাকা পড়ে গেছে সামনের সাইনবোর্ড ও দৃষ্টিনন্দন ফ্রেসকো। ভেতর থেকে ভেসে আসছে জোর করতালি আর গমগমে ভাষণ।
আমি আমার লাগেজের দিকে হাত বাড়াতেই মোহন সিং বললেন: থাক, প্রফেসর, অনুষ্ঠান তো শুরু হয়ে গেছে। এখন আর গেটাপ-মেকাপের সময় পাবেন না। সুটকেসসহই আপনাকে রেসিডেন্সে পৌঁছে দেবো আমি।
*                   *      *
অডিটোরিয়ামটা তিন তলা। আমরা পেছনের দরজা দিয়ে হলে প্রবেশ করতেই প্রধান সমন্বয়কারী শ্রী দেব ভরদ্বাজ সবাইকে উঠে দাঁড়াতে বললেন। তালে তালে করতালির (ধিন-ধিন-ধিনকা-ধিন)-এর মধ্যে দিয়ে আমরা গিয়ে উঠলাম স্টেজে। গাঁদা ফুলের মালার বাহুল্যে মাথা প্রায় ঢেকেই গেল আমার আর জ্যানেটের। মোহন সিং যেহেতু পাঞ্জাবী, তাই অনেক মালাই ফিরিয়ে দিতে পারলেন।

দেবজী আমাদের সঙ্গে আলিঙ্গন করলেন এবং আমাদেরকে হাগ করতে উঠে দাঁড়ালো লিথুয়ানার কবি জুর্গা ইভানুস্কাইটে, জাপানি কবি আকেমী ইয়ামাদা, কাজাখ-কবি মায়া বাইদোলেটোভা, শ্রীলঙ্কার এমজিকেকে সেনাভিরত্নে এবং ভারতীয় কবি গায়ত্রী সারাফ। একটু পরে এসে গালে চুমু খেল রোমানিয়ান-সুন্দরী মিরেলা মাতেয়ী। আমি আন্তর্জাতিক সাহিত্য মণ্ডলে প্রথম এসেছি বলে খানিকটা সংকুচিত এবং দ্বিধান্বিত ছিলাম। কিন্তু ড. জুর্গার খোলামেলা জোকস্‌ শুনে সে জড়তা কেটে যেতে সময় লাগলো না। পরমা সুন্দরী জুর্গা স্বতঃস্ফূর্ত চাঞ্চল্যে জানালো: সাংসদ ড. পভন কুমার সকাল ন-টায়ই উদ্বোধন করেছেন অনুষ্ঠান। এরপর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন কবি ও ক্রিটিক গুরুদেব চৌহান খুবই সুন্দর আবৃত্তি তার। আমি প্রেমে পড়ে গেছি চৌহানের। এখন কথা বলছেন এ-অধিবেশনের সম্মানিত সভাপতি মিস্টার মোহন ভাণ্ডারি প্রমিনেন্ট ফিগার ফ্রম পাঞ্জাবী আর্ট অ্যান্ড কালচার।
পাঞ্জাবীরা এমনিতেই দেখতে খুব সুদর্শন। তারপর এসেছে সাজগোজ করে। সামনের সারিতে বসা অনেক নারীর শরীর থেকে চোখ ফেরানো দায়। জুর্গা আমার কানে কানে বললো: মি ইজ নট বিহাইন্ড, প্রফেসর। লুক ঝটিতে সে ওড়না সরিয়ে দেখিয়ে দিলো তার নিজস্ব পেলব-পাহাড় আর স্বল্পালোকিত-গিরিখাদ। আমি হতভম্ব! সে হেসে বললো: ইফ ইউ আর ওমর খাইয়াম, হোয়াই আই ওন্ট বি দ্য সাকী অফ পার্সিয়া? তাকিয়ে দেখি, আমার ইন্ট্রোডাকটরী বুকলেট খুলে সে আমার রুবাইয়াত দেখাচ্ছে আমাকে। মনে মনে ভাবলাম- সেরেছে রে, এর হাত থেকে পালিয়ে বাঁচাই দায় হবে দেখছি!
সামনের দর্শক-সারির এক তরুণ খেয়াল করেছে জুর্গার বুক-দেখানোর ব্যাপারটা। সে একটা চিরকুট পাঠালো স্টেজে-উইল ইউ রিসাইট ফর মি, জুর্গা? কৌতূহলী চোখে তাকাতেই ছেলেটা মাথার পাগড়ি নেড়ে চমৎকার হাসি দিয়ে নিজেকে চিনিয়ে দিলো। বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে জুর্গা তখনই পাঠালো লিপ-কিস। ছেলেটা ল ায় লাল হয়ে গেল নিজের সিটে বসেই।
প্রথমে জ্যানেট, এবং পরপরই আমার নাম ধরে ডাকা হলো অ্যানাউন্সমেন্টে। একটানা আড়াই দিন জার্নি করে আমি বোর্ড বাজার থেকে মুসাফিরে পৌঁছেছি-বিধ্বস্ত হয়ে। ক্লান্তিতে শরীর অবসন্ন। তার ভেতরেই মিনিট পাঁচেক কথা বলে আবৃত্তি করলাম দুটো কবিতা। প্রথমটার নাম ‘অসুখ’-আফগানিস্তানের রুশ দখলদারিত্বের বিরদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ:

আফগানিস্তান: ১৯৮২

সাড়ে তিন হাত হাড় কবরের ভুঁই
ফুল পাখী নদী নীড় দেবোনা কিছুই
দেবোনা যবের ছড়া
ফসলের শতকরা
সবুজে শ্যামলে আঁকা থোকা থোকা জুঁই
নাও নদী ঢেউ জল দেবো না কিছুই।

গজনী কাবুল হিরা খাইবার পাস্‌
দেবো না পাহাড়ি গান লু-বহা বাতাস
যে ভাষায় কথা কই
ধার দিতে রাজি নই
চাঁদের সুষমা আর ফুলের সুবাস
দেবো না গানের সুর সেতারা-আকাশ।

দেবো না পালিয়ে যেতে কোনো হানাদার
রক্তের লোভে যারা আসে বার বার
বারুদের উপহার
যত চাই দেবো, আর
উজাড় দু’হাত ভরে শোধ দেবো ঋণ
যাবো না সীমানা ছেড়ে ইঞ্চি জমিন।

খুন আর খুনিদের কালো ইতিহাস
দেবো না দীর্ঘ হতে মায়ের নিশ্বাস
গৃহ গ্রাম নদী জল
উৎসব কোলাহল
আশিশু লালিত ভূমি চকোরীর গান
দেবো না উদাস হাওয়া প্রেমের উঠান।

দেবো না বাপের ভিটে হ্রদ টলোমল
পাহাড়ের চূড়া আর ঝর্ণার জল
যতদিন অধিকার
ফিরে পাবে নদী তার
দেবো না কিছুই এর খোদার কসম
ততদিন অসুখের নেই উপশম।...

কবিতাটি নজরুলের সৃষ্টি সুখের উল্লাসের ছন্দে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা। প্রথম ইংরেজি অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ আলমগীর। প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, কিং ফয়সাল স্কুল ও কলেজের প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল এবং বহুগ্রন্থ প্রণেতা- এবং ইংরেজিতে খুবই পারদর্শী২।
করতালিতে ফেটে পড়লো মুসাফির। নাইজেরিয়ান কবি ওলালেরে ওলাদিতান এসে বুকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়ে বললেন: ভেরী ইমপ্রেসিভ! আই উইল টেক ইট টু মাই কান্ট্রি নাইজেরিয়া...। যাবে তো?
আবারো করতালিতে মুখরিত হলরুম। এরপর পড়লাম ছোট্ট একটি কবিতা-প্রেমের রাজাধিরাজ কবি হাফেজ শিরাজীকে নিবেদিত-

হাফেজ! -তোমার গালের তিল
আমাকে করেছে দিওয়ানা-দিল
শূন্য করেছে তৃষিত হৃদয়
রক্ত আকাশ বেদনা-নীল।

তোমার লাইলী ইরানী হুর
আমার দু’চোখে জ্বেলেছে নূর
তামাম দুনিয়া দোজ্‌খ হয়েছে
ইশকে পুড়েছে জব্‌ল-এ তূর।

আমি উন্মন দূর দেশের
আঁখিতে মেখেছি সুর্মা ফের
ভুলে যেতে চাই বিরহের জ্বালা
ভুলেছি পতন পারস্যের।

সমরখন্দ ও বোখারা আজ
নেই হাতে নেই তখত-তাজ
গরিব তবুও বিকিয়ে দিয়েছে
যা ছিল, শিরিন শুনে আওয়াজ।

বুলবুল! ফের গান শোনাও
হাফেজের সুরে সুর মেলাও
নেশাতুর ঠোঁটে রাখো চুম্বন
দুনিয়া বেহেশ্‌ত বানিয়ে নাও।

প্রায় অবিকল ছন্দ বজায় রেখে কবিতাটির সার্থক অনুবাদ করে দিয়েছেন অনুজপ্রতীম রাজ রিডার। পড়তে শুরু করলাম মঞ্চে পায়ের তাল ঠুকে ঠুকে।

Hafeez! Your cheek got a mole
That captured my lover soul
Emptied my thirsty heart
Make the red sky blue with dole.

Your Layla, Persian Hoor
Lightened my eyes with divine noor
The whole world has become a hell
The Love had burnt Jabel-i-Toor.

From distance, I’m insane
Blacken my eyes with Surma again
Want to forget heart’s pang;
Fall of Persia: forgotten.

Bokhara and Samarkhand of the age
Has no scepter or holy sage
Sold everything the poor had
Shirin learnt it from the historical page

Bulbul! Sing that you wrote
As like as Hafeez’s note
Kiss the tipsy lips
Make the world heavenly mote.

পাঞ্জাবীরা আনন্দপ্রিয় জাতি। দুটো মেয়ে, দর্শক-সারি থেকে মঞ্চে উঠে এসে দেবজীকে বললো: রিপিট ইট-স্যার, প্লিজ। আমি আবার পড়লাম, এবার একটু ধীরে ধীরে। মেয়ে দুটো ঘাগড়ায় ঢেউ তুলে নেচে বেড়ালো মঞ্চ জুড়ে। আমি হতভম্ব হয়ে থেমে যাই বার বার-আর দর্শকরা চেচিয়ে ওঠে- প্রসিড অন, প্রসিড অন।
কী ধরনের রোমাঞ্চে মানুষ জ্ঞান হারায়-আমি তো বুঝতে শুরু করার আগেই মোহন সিং এসে আমার গলায় কাশ্মীরি শাল এবং মাথায় নেপালী টুপি পরিয়ে দিয়ে মাইকে চেচিয়ে উঠলেন: থ্রি চিয়ার্স ফর বাংলাদেশ।
বলাই বাহুল্য-হিপ হিপ হুড়রেতে কেঁপে উঠলো পুরো চব্বিশ নম্বর সেক্টর।
আমার পাঠের পর কবিতা পড়লেন মোহন সিং, ড. জুর্গা, মিরেলা মাত্রেয়ী এবং আরো কয়েকজন। কিন্তু আবেগে উদ্বেল এবং ক্ষুধায় কাতর আমার কানে সেসব তেমন প্রবেশ করেনি। শুধু ড. ওলারেলের কাব্যের পর যে ওয়াহ-ওয়াহ গর্জন উঠলো তাতেই একটু সচেতন হলাম মাত্র।
লাঞ্চের আয়োজন করা হয়েছে তেইশ নাম্বার সেক্টরের ‘মেহফিল’ রেস্টুরেন্টে। দুটো এসি-বাসে করে গেলাম সবাই। বিরিয়ানি, পোলাও, তান্দুরী-চিকেন এবং পাঞ্জাবী-সালাদে উদর পূর্তি করে মোহনজিকে বললাম: দাদা, একটু বিশ্রাম না নিলেই যে নয়।
নো, প্রোব্লেম, কবি ভাই। আমি আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি একটু পরেই।
রাষ্ট্রীয় অতিথিশালা পাঞ্জাব-ভবনে নির্ধারিত হয়েছে বিদেশি কবিদের বাসস্থান। মোহনজী আমাকে আধা ঘণ্টার মধ্যেই নিয়ে গেলেন সেখানে। পুব দিকে তিন নম্বর সেক্টরে এই বিলাস বহুল সার্কিট হাউজ। রিসেপশনে পাসপোর্ট ভিজিটিং কার্ড দিয়ে বললাম: প্লিজ- একটু পরে সাইন করবো আমি। খুবই ক্লান্ত। রাখুন এগুলো।
ওকে স্যার, নো প্রোব্লেম।
কেতাদুরস্ত খানসামা আমাকে রুমে পৌঁছে দিতেই জানতে চাইলাম: গিজার হ্যায়, ভাইয়া?
সার্টেনলি, স্যার। আমি এখুনি ‘অন’ করে দিচ্ছি। শাওয়ারের পরে এই সুইসটা বন্ধ করে দেবেন, প্লিজ।
এই হলো মিতব্যয়ী ভারত-যা আজ তাকে পরাশক্তিতে পরিণত করেছে।
আপনি বিশ্রাম করুন, বুলবুল। আমি পাঁচটায় এসে আপনাকে তুলে নেব। বলে বিদায় নিলেন মোহনজী।
গরম পানিতে গোসল করে একটু ফ্রেশ হলাম বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েই মনে পড়লো এই দীর্ঘ যাত্রার সাতকাহন।
দেবজী আমার নাম-ঠিকানা কিভাবে পেয়েছেন জানি না-তবে বাংলাদেশ থেকে একটা প্রাথমিক বাছাই হয়েছিল অন-লাইনে। নির্বাচিতদের লেখা বাছাই করে কবি-নির্বাচন করেছেন সুনীল দা এবং অন্নদাশংকর রায়। আমার কবিতা তখনো ইন্টারনেটে তেমন ছিল না। তিনটি বই তারা যোগাড় করেন ডাকযোগে আর রিকমেন্ডেশান পান আমেরিকান গবেষক ড. বেটি ব্লেয়ার এবং বাংলাদেশের কবি আল মাহমুদের কাছ থেকে। আর এর নেপথ্যে ছিলেন ফজল ভাই (কবি ফজল শাহাবুদ্দীন)। ফাইনাল সেলেকশন পৌঁছায় বাউবি’র উপাচার্যের কাছে-যেখানে যাতায়াত খরচের কোনো উল্লেখ ছিল না। বাউবিশিসের সদস্য আনিসুর রহমান এবং রেজিস্ট্রার মনজুরে খুদা তরফদারের সুপারিশে ভিসি আমার যাতায়াতের সমস্ত খরচ অগ্রীম দিয়ে একটি ব্রোশিওর ছাপতে বলেন প্রকাশনা বিভাগকে। নাম হবে ‘ইন্ট্রোডাকশন টু বুলবুল সরওয়ার এন্ড হিস পোয়েট্রি’।
চরম তাড়াহুড়ার মধ্যে সবকিছু সম্পন্ন করে বেনাপোল-কলকাতা-দিল্লি হয়ে চন্ডিগড়ে পৌঁছাই শেষ কোটার টিকেটে। সোহাগ ভুল করে নন-এসি বাসে তুলে দেয় আমাকে। প্রচণ্ড বাজে আবহাওয়ায় ধুঁকতে ধুঁকতে কলকাতা পৌঁছে রাজধানীর টিকিট না পেয়ে ইন্ডিয়ান এয়ার লাইনসে দিল্লি আসি ন-হাজার রুপিতে টিকেট কেটে। তারপর ‘শতাব্দী চন্ডিগড়ে’ চড়ে এখানে পৌঁছি দুপুর সাড়ে দশটায়। আর ফেস্টিভ্যাল উদ্বোধিত হয় ন-টা ত্রিশে। ভাবতে ভাবতে আমি ঘুমিয়ে পড়ি রাজকীয় কোমল বিছানায়। যার বালিশগুলো পাখির পালকে তৈরি!
বিকাল সাড়ে পাঁচটায় ফের পৌঁছি মুসাফিরে। মোহনজীই নিয়ে এসেছেন। এবার তার পরনে শেরোয়ানী, আমার গায়ে একুশের কবিতা-লেখা পাঞ্জাবী। মোহনজী হেসে বলেন: আপনাদের ভাষা আন্দোলন, তাই না?
কি করে, চিনলেন?
ঐ মিনার কি পৃথিবীর সবাই চেনে না এখন? আর আমি তো প্রবাসী-ভারতীয়। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল-ভুটান-শ্রীলঙ্কাকে তো ইউরোপীয়নরা গ্রেটার ইন্ডিয়া হিসেবেই চেনে। তাই খোঁজ খবর রাখতে হয়।
গ্রেটার ইন্ডিয়া-মনে মনে তখনই ভাবনাটা আসে যে ভারত নিয়ে বই লিখলে তার নাম দেবো ‘মহাভারতের পথে পথে’। শেষ শব্দটা বাদ দিতে হয় বউয়ের চাপে-তার মতে একটা পথই শেষ কথা; যার কোনো শেষ নেই। মেনে নিলাম...।
আপনার কার্ডে দেখলাম-আপনি ব্যবসায় জড়িত। কি করেন আপনি, মোহনজী?
ব্যবসা করি। এক্সপোর্ট ইমপোর্ট। ভারতীয় ও পাকিস্তানি পোশাক এবং জুতার দোকান আমার। বছরে ষাট লাখ রুপি টার্ন ওভার ছিল। গত বছর পৌঁছেছি কোটিতে।
বাহ্‌! ওয়ান্ডারফুল। তা, কবিতা লেখেন কখন?
খুব বেশি লিখিনা। তরুণ বয়সে চরম নেশা ছিল, এখনও শুধু ডোনেশন দেই কবিতার অনুষ্ঠানে। আর এটা তো পাঞ্জাবের সবচেয়ে মর্যাদাবান আয়োজন। যদিও এবার একটু হছ-পছ হয়েছে।
কি রকম?
অতিথিদের থাকা নিয়ে সামান্য সমস্যা হয়েছে স্থানীয় সাংসদকে প্রধান অতিথি না করায়। তবুও ‘ইন্টার-কন্টিনেন্টাল কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন ইন্ডিয়া’ এবং ‘চন্ডিগড় প্রশাসনের জনসংযোগ বিভাগ’ পূর্ণ সহযোগিতা দিয়েছে। কিন্তু দেবজী সাংসদের সাথে ঝগড়া করায় মুখ্যমন্ত্রী আসতে রাজি হননি। এটা বিরাট ব্যর্থতা আমাদের। পাঞ্জাবীরা কখনো এ-ধরনের বিভেদ পছন্দ করে না।
সরকার টাকা দেয়নি?
দিয়েছে। কিন্তু পাঞ্জাব ভবনে সব অতিথির জন্য রুম বরাদ্দ পাইনি আমরা। এটা বড় ধরনের অসম্মান আয়োজকদের জন্য।
তাহলে, আমাকে নিলেন যে ওখানে? আমি তো সবার জুনিয়র।
কিন্তু আপনি এগিয়ে আছেন প্রকাশনায় এবং আপনার নামের অ্যালফাবেটের কারণে।
ও-আচ্ছা, আমি হেসে বললাম: প্লেনে বরাবর সিট পাই শেষে, কারণ সারনেম শুরু হয়েছে ‘এস’ দিয়ে। আপনারা দেখি মূল নামকে আমলে নিয়েছে আমাকে উপরে তুলে দিয়েছেন-তাই ‘বি’ পেয়েছে দ্বিতীয় স্থান। সৌভাগ্য আমার! আচ্ছা, এখনকার প্রোগ্রাম কি, মোহনজী?
বিকেলে ছিল দ্বিতীয় ওয়ার্কশপ মিস করেছেন আপনি। এখন চলছে কবিতা-পাঠ। পাঞ্জাবী ও অন্যান্য ভারতীয় কবিদের। এরপর আছে ফটোসেশন এবং ‘মিট দ্য প্রেস’। সেখানে আপনাকে বাংলাদেশের কবিতা সম্পর্কে বলতে হবে।
হায় আল্লাহ! আমি কি বলবো?
সে আপনি ভালো জানেন, বুলবুল।
আমার শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে এলো উপাচার্য এরশাদুল বারীর দূরদর্শিতার কাছে। যদিও লোকটা একরোখা এবং বেশ প্রান্তিকীয়-কিন্তু অভিজাত বিষয়-আশয়ে তার কাণ্ডজ্ঞানের জুড়ি মেলা ভার। আসার আগে বাংলাদেশের কবি ও কবিতা নিয়ে একটা ছোট্ট প্রবন্ধ লিখিয়েছেন আমাকে দিয়ে- তারপর নিজে কারেকশান করেছেন ষোলো-সতেরো বার। তার ছেলে তানিম আমার গলদঘর্ম অবস্থা দেখে বললো: ঘাবড়াবেন না, আংকেল। আব্বুর সংশোধন ও-রকমই। নিজের লেখা নিজেই কাটেন আবার পরের বার কাটা অংশ জুড়ে দেন। কে কেটেছে বলে বকাও খাবেন।
সন্ধ্যার পর মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালানো হলো। আমি আমার পাশে বসা গায়ত্রী সারাফকে বললাম: দিদি, এই প্রদীপ কেন জ্বালানো? তাও আবার এক মুসলিমকে দিয়ে?
কি হয়েছে, তাতে? নামই তো মঙ্গল-প্রদীপ। অমঙ্গল মানেই তো আঁধার, পাপ, কলুষতা, ঈশ্বরহীনতা। পক্ষান্তরে মানবতা, ধর্ম, ঈশ্বর, জ্ঞান-এসবই তো আলো। এতে মুসলমান-হিন্দু ভেদ কিসের?
ও-আচ্ছা, আমি মেনে নিলাম।
কেন, বাংলাদেশে কি এটা অন্য দৃষ্টিতে দেখা হয়, কবি সাহেব?
না, ঠিক তা নয়-তবে কিছুটা বিতর্ক আছে। বিশেষত গোঁড়াদের কাছে।
সে-তো সর্বত্রই আছে। আমাদের হিন্দু ধর্ম আর বিজেপীর হিন্দুত্ব কি এক? কখনো না। গান্ধীর মতো মহাত্মাকে যারা হত্যা করে-তাদের মুখে আর যাই মানাক, রাম-নাম মানায় না। নাকি?
মোহনজী আমার আলাপচারিতায় বাধা দিয়ে বললেন: এক্ষুণি আপনার হাম ডাকা হবে, বুলবুল। গেট রেডি।
স্টেজে উঠতে উঠতে মনকে শক্ত করলাম।.

লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান-কমিউনিটি মেডিসিন, গণস্বাস্থ্য সমাজ ভিত্তিক মেডিকেল কলেজ, সাভার, ঢাকা।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

আপনার মতামত দিন

‘অনুগত কমিশন দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়’

মিরপুরে ফ্যাক্টরিতে আগুন

সশস্ত্র বাহিনী দিবসে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

কারওয়ান বাজারে আগুন

৬৪ আসনে মনোনয়ন তুলেছে জামায়াত

ঝিনাইদহে জঙ্গি অভিযান, নব্য জেএমবির সদস্য আটক

‘অস্তিত্ব সংকটে আছি আমরা’

পাবনায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত ১

ট্রাক্টরের চাপায় ছাত্রলীগ নেতা নিহত

সারাদেশে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ৫

ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলা, নিহত ৪৩

গণভবনে এরশাদ-বি. চৌধুরী

৬৪ জেলায় মেনটর নিয়োগ পরে বাতিল

প্রার্থী তালিকায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম

আমাদের নির্বাচনের দিনটি চুরি-ডাকাতির দিন হয়ে গেছে

সচিব, ডিএমপি কমিশনারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা দাবি