রূপকথা

চেক রূপকথা বারো মাস

ঈদ আনন্দ ২০১৮

ভাষান্তর : অনন্ত উজ্জ্বল | ২৮ জুন ২০১৮, বৃহস্পতিবার
অনেক অনেক বছর আগে চেক দেশে পাহাড়ের ধারে গভীর জঙ্গলের পাশে এক মা বাস করতো। তার স্বামী ছিল না। শুধু ছিল দুই মেয়ে। এক মেয়ে ছিল তার নিজের। আর অন্যজন  তার সৎমেয়ে। সে নিজের মেয়েকে অনেক বেশি ভালোবাসতো। নিজের মেয়ের মতো সৎমেয়েকে সে ভালোবাসতো না। এর একমাত্র কারণ ছিল, সৎমেয়ে মারুসা, মহিলার নিজের মেয়ে হোলেনার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দরী ছিল।
শান্ত, ভদ্র মানবিক মনের মারুসা জানতো না, সে কেমন অপরূপ সুন্দরী!  সে বুঝতে পারতো না কেন তার সৎমা তাকে দেখলেই রেগে যায়।
মারুসা বাড়ির সব কাজ একা একা করতো। ঘরের ভেতর-বাহির গুছিয়ে রাখতো। সকালের, দুপুরের এবং রাতের জন্য খাবার রান্না করতো। বাড়ির সবার ময়লা কাপড়চোপড় পরিষ্কার করতো। এমনকি কাপড় সেলাইও করতো। এত কিছুর পরও সে প্রতিদিন বাড়ির বাইরে গোয়াল ঘরে রাখা গরুগুলোকে খড় খেতে দিত এবং তাদের দেখাশোনা করতো। এই সবগুলো কাজ সে একা একা করতো। তাকে তার সৎমা ও বোন কেউ সাহায্য করতো না। মারুসা যখন কাজ করতো সৎবোন হোলেনা তখন নিজের রূপচর্চা আর আরাম আয়েশে সময় কাটাতো।  
কিন্তু মারুসা খুব কাজ পছন্দ করতো, সে অনেক ধৈর্যশীল ছিল। যখন তার সৎমা তাকে বিশ্রি ভাষায় গালিগালাজ করে সারা দিনের কাজের ভুলত্রুটি খুঁজে বের করতো, সে তখন ছোট্ট ভেড়ার বাচ্চার মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতো। এটা মোটেই সম্মানজনক ব্যবহার ছিল না মারুসার জন্য। যাই হোক, মারুসার প্রতি এই রকম খারাপ ব্যবহার করে হোলেনা আর তার মা দিন-দিন নিষ্ঠুর থেকে আরো নিষ্ঠুরতর হয়ে উঠতে লাগলো। এর একটিমাত্র কারণ, মারুসা দেখতে দিন-দিন আরো সুন্দরী হচ্ছে, আর হোলেনা দেখতে দিনে দিনে আরও কুশ্রী হচ্ছে।
অবশেষে হোলেনার মা একদিন চিন্তা করলো: “সুন্দরী, পরিশ্রমী এবং ভালো এই মেয়েকে কি তার বাড়িতে রাখা ঠিক হবে? মেয়ে হোলেনার বিয়ের জন্য যখন তার বাড়িতে ছেলেরা আসবে, তখন তারা সুন্দরী মারুসাকে দেখে তার প্রেমে হাবুডুবু খাবে আর হোলেনার দিকে কেউ ফিরেও তাকাবে না।”
এটা ভাবতে ভাবতে মারুসার সৎমা আর তার সৎবোন হোলেনা গরিব অসহায় মারুসাকে কিভাবে বাড়ি থেকে তাড়ানো যায়, সেই ষড়যন্ত্র করতে শুরু করলো। সারাক্ষণ তারা ভাবে। নানান ফন্দি ফিকির করে। কোনোটাই মনের মতো হয় না। শেষে কোনো বুদ্ধি না করতে পেরে তারা মারুসাকে ভীষণ মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দিল। কিন্তু মারুসা বাড়ি থেকে কোথাও গেল না। সারা দিন বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁদলো আর অপেক্ষা করলো। সৎমা এবং বোনের সব অত্যাচার মেনে নিয়ে মাথা নিচু করে সন্ধ্যায় সে আবার ঘরে ফিরে আসল।

সৎমা আর বোনের অত্যাচার সহ্য করে মারুসা তাদের বাড়িতে রইলো। এভাবে দিন যাচ্ছে। বছর যাচ্ছে। মারুসা বড় হচ্ছে আর সুন্দরী থেকে অপরূপ সুন্দরীতে পরিণত হচ্ছে দিনের পর দিন। হোলেনার মা মারুসার এই অপরূপ সুন্দর রূপ দেখে আর হিংসায় দাঁত খিটমিট করতে থাকে। কিন্তু কোনোভাবেই তারা মারুসাকে বাড়ি থেকে তাড়াতে পারে না। শেষমেশ তারা মারুসার জন্য ঠিক করলো নিষ্ঠুর নির্মম এক নির্যাতন কৌশল যা আগে কেউ কখনো কল্পনাও করেনি। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। একদিন সকালে- সময়টা ছিল জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি- হোলেনা ভায়োলেট ফুলের সুভাস নেয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলো। সে তার সৎবোনকে বললো, যাও মারুসা, বনের মধ্য থেকে আমার জন্য কিছু ভায়োলেট ফুল নিয়ে আসো, আমি আমার কোমরে সেগুলো পরবো এবং তাদের সুবাস নেবো। আসলে ভায়োলেট ফুল কোমরে পরা তার সুবাস নেওয়া এগুলো সব মিথ্যা কথা। হোলেনা আর তার মায়ের উদ্দেশ্য এই তীব্র ঠাণ্ডার মধ্যে মারুসাকে বনে পাঠানো। তারা ধরেই নিয়েছে এই তীব্র ঠাণ্ডায় মারুসা বনের মধ্যে ভায়োলেট ফুল সংগ্রহ করতে গেলে সে আর ফিরে আসতে পারবে না। ঠাণ্ডায় জমে তার নিশ্চিত মৃত্যু হবে।
হোলেনার বায়না শুনে মারুসা বললো, “প্রিয়! বোন আমার। এ কি অবাক করা কথা বলছো তুমি! কেউ কি আগে কখনো শুনেছে এই জানুয়ারি মাসে তীব্র ঠাণ্ডার মধ্যে বরফের উপরে ভায়োলেট গাছ জন্মে?”
“মারুসা, হতভাগ্য, ছোটলোক কোথাকার! তুমি কিভাবে আমার সঙ্গে তর্ক করো, যখন আমি তোমাকে কোনো কাজ করার কথা বলি? অবশ্যই তুমি এই ঠাণ্ডায় বনের মধ্যে যাবে এবং আমার জন্য ভায়োলেট ফুল নিয়ে আসবে। যদি তুমি আমার জন্য বন থেকে ভায়োলেট ফুল নিয়ে না আসতে পারো, তাহলে আমি তোমাকে হত্যা করবো।” হোলেনা মারুসাকে হুমকি দিয়ে বললো।
মারুসার সৎমা তাকে দুই হাত দিয়ে জাপটে ধরে, টানতে টানতে দরজার বাইরে নিয়ে এলো এবং ঘরের বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। অসহায় মারুসা আর কোনো উপায় না পেয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কঁদতে কাঁদতে বনের পথে রওনা হলো। সে দেখলো, বনের মধ্যে বরফের পুরু স্তর পড়ে আছে এবং কোথাও কোনো মানুষের পায়ের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। মারুসা এমন নির্জন একটা ভয়ঙ্কর বনের মধ্যে একা একা অনেকক্ষণ এলোমেলো ঘুরে বেড়ালো, এক পর্যায়ে সে ভয়ঙ্কর ঠাণ্ডায় কাঁপতে লাগলো আর ক্ষুধায় ক্লান্ত হয়ে গেল। এই পরিস্থিতিতে মারুসা ঈশ্বরের কাছে তার নিজের মৃত্যু কামনা করে প্রার্থনা করল।
এর কিছুক্ষণ পরে মারুসা বনের মধ্যে অনেক দূরে একটা হালকা আলো দেখতে পেল। আলোটা দেখতে পেয়েই সে ওই উজ্জ্বল আলোর দিকে এগিয়ে গেল। যেতে যেতে শেষ পর্যন্ত পৌঁছে গেল একটা পবর্তের চূড়ায়। বিশাল একটা আগুনের কুণ্ডলী জ্বলছিল সেখানে। সেই আগুনের চারপাশে ১২টি পাথরের উপরে বসে আছে ১২ জন মানুষ। তাদের মধ্যে তিন জনের ছিল তুষার শুভ্র সাদা দাঁড়ি, তিন জন ছিল যারা দেখতে খুব বেশি বৃদ্ধ না, অন্য তিন জন ছিল টগবগে যুবক। আর বাকি তিন জন যুবক ছিল অন্য সকলের থেকে দেখতে তরুণ, সবল এবং সুদর্শন। তারা কেউ কোনো কথা বলছিল না। সকলেই নীরব বসেছিল বিশাল আগুনের কুণ্ডলীর চারপাশে। এই ১২ জন মানুষই হচ্ছে এক বছরের ১২ মাস। বছরের প্রথম মাস জানুয়ারি বসে আছে সব থেকে উঁচু পাথরের উপরে। তার চুল এবং দাঁড়ি দেখতে ঠিক শুভ্র সাদা তুষারের মতো এবং তার হাতের মধ্যে ধরা আছে একটা কাঠের মুগুর।
এই দৃশ্য দেখে মারুসা অনেক ভয় পেল। সে যেকোনো একটা আকস্মিক বিপদের জন্য অপেক্ষা করছিল। কিন্তু সাহস হারাল না। সে ধীরে ধীরে ওই ১২ জন মানুষের দিকে এগিয়ে গেল এবং বলল: “অনুগ্রহ করে আপনারা আমাকে সাহায্য করবেন? আমার ঠাণ্ডা হাত দুটো আপনাদের আগুণের আঁচে গরম করতে দেবেন? আমি ঠাণ্ডায় ভয়ঙ্কর কষ্ট পাচ্ছি। আমি সম্ভবত মরে যাবে।”
সব থেকে উঁচু পাথরে বসে থাকা জানুয়ারি তার তুষার শুভ্র দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে মারুসার দিকে ঘুরে তাকালো এবং জিজ্ঞেস করলো: “সোনা বাচ্চা, ছোট্ট পাখি মা আমার, তুমি কেনো এখানে এসেছো? তুমি এখানে কি খোঁজ করছো?”
মারুসা উত্তর দিল: “আমি ভায়োলেট ফুলের খোঁজে এখানে এসেছি।”
জানুয়ারি অনেক অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে বললো: “তুমি এটা কি বলছো মা, তুমি কি জানো না ভায়োলেট ফুল খোঁজার সঠিক সময় এটা না। এখন তো সব ভায়োলেট ফুল শক্ত বরফের নিচে ঢাকা পড়ে আছে।”
মারুসা বললো “আমি জানি সেটা কিন্তু আমার সৎবোন আর সৎমা আমাকে বলেছে, বনের মধ্য থেকে অবশ্যই আমাকে ভায়োলেট ফুল খুঁজে নিয়ে যেতে হবে। যদি আমি তাদের জন্য ভায়োলেট ফুল খুঁজে না নিয়ে যেতে পারি তাহলে তারা আমাকে হত্যা করবে।”
মারুসা কাঁদো কাঁদো গলায় আরো বললো, “প্রিয় পিতা, অনুগ্রহ করে বলুন এই বিশাল বনের মধ্যে আমি কোথায় সেই ভায়োলেট ফুল খুঁজে পাবো।”
মারুসার ভয়ার্ত চেহারা দেখে জানুয়ারি উঠে দাঁড়াল এবং তার একটু পাশে বসে থাকা এক যুবকের দিকে এগিয়ে গেল। জানুয়ারি যার দিকে এগিয়ে গেল সে ছিল মার্চ মাস। জানুয়ারি মার্চ মাসের হাতে তার কাঠের শক্ত মুগুরটা তুলে দিয়ে বললো: “অল্প বয়সী তরুণ ভাই আমার, এই মুগুর হাতে নিয়ে উপরের ওই আসনে গিয়ে বসো।”
মহান সহানুভূতিশীল জানুয়ারির নির্দেশ মতো মার্চ উঁচু পাথরের উপরে গিয়ে বসলো। তারপর হাতের মুগুরটাকে আগুনের কুণ্ডলীর উপর ঢেউয়ের মতো ঘুরাতে লাগলো। ঢেউয়ের মতো ঘুরতে থাকা মুগুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জোরে আরো জোরে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠলো। আগুনের তীব্র আঁচে বনের মধ্যে জমে থাকা শক্ত বরফ গলতে শুরু করল। বনের গাছগুলোতে কচিপাতা গজাতে শুরু করলো। বনের মধ্যে যত ফাঁকা জায়গা ছিল সব জায়গা কচি ভায়োলেট গাছে, নানান আকারের ছোট বড় ফুলে, ফলে আর ঘাসে ভরে গেল। মারুসা দেখলো সুগন্ধী ডেইজি ফুলের কচি পাপড়ি ফুটে উঠতে শুরু করেছে ঘন ঘাসের মধ্য দিয়ে। সত্যিই মনে হচ্ছে এটা বসন্তের সময়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝোপ ঝাড়ের ভিতর ছোট ছোট পাতার মধ্য থেকে থোকায় থোকায় ভায়োলেট ফুল ফুটতে শুরু করলো। মারুসা দেখল, প্রচুর পরিমাণে ভায়োলেট ফুল ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফুটে আছে তার চার পাশে। চারি দিকে ভায়োলেট ফুলের সমারোহ দেখে মারুসার মনে হলো কেউ হয়তো বাগানের মধ্যে নীল কাপড়ের চাদর বিছিয়ে রেখেছে।
মার্চ বললো, “মারুসা, চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ফুলগুলো তাড়াতাড়ি তুলে নাও।”
মারুসা মার্চের নির্দেশ মতো আনন্দ চিত্তে ফুটন্ত তর তাজা ভায়োলেট ফুল তুলতে শুরু করল। ফুল তুলতেই থাকলো তার হাত ভরে না ওঠা পর্যন্ত। সে মহান জানুয়ারি এবং তরুণ মার্চ মাসকে তার হৃদয়ে আন্তরিক ধন্যবাদ দিয়ে খুশিতে নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরে গেল।
হোলেনা এবং তার মা খুবই অবাক হলো যখন তারা দেখলো মারুসা ভায়োলেট ফুল নিয়ে ফিরে আসছে। মারুসার ঘরের প্রবেশের জন্য তার ঘরের বন্ধ দরজা খুলে দিল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই ভয়োলেট ফুলের মন মাতানো গন্ধে তাদের ঘর ভরে গেল।
হোলেনা মারুসাকে গম্ভীর এবং রাগান্বিভাবে জিজ্ঞেস করলো, “তুমি কোথায় কিভাবে এই ফুলগুলো পেলে?”
মারুসা বললো, “বনের মধ্যে অনেক উঁচু পাহাড়ের উপরে, ঝোপঝাড়ে ঘেরা জঙ্গলের মধ্যে এই ফুলগুলো ফুটে আছে।”
হোলেনা আর কথা না বাড়িয়ে ফুলগুলো দিয়ে মালা বানিয়ে তার গলায় আর কোমরে পরলো। তার মাকে বললো, ফুলগুলোকে নাকের কাছে নিয়ে ভালো করে সুবাস নেওয়ার জন্য। কিন্তু মারুসাকে ফুলের ঘ্রাণ নেওয়ার জন্য সে কিছু্‌ই বললো না।
এই ঘটনার বেশ কিছুদিন পরে, এক অলস বিকেলে হোলেনা হেলে দুলে রান্না ঘরের দিকে গেল। কিছুক্ষণ পরে রান্না ঘর থেকে ফিরে এসে আকস্মিকভাবে সে বললো, তার এখন স্ট্রবেরি খেতে মন চাচ্ছে এবং সে মারুসাকে চিৎকার করে ডাক দিয়ে বললো, “মারুসা এখনই বনের মধ্যে যাও এবং আমার জন্য কিছু স্ট্রবেরি সংগ্রহ করে নিয়ে আসো। আমি স্ট্রবেরি খাবো।”
মারুসা অবাক হয়ে বললো, “প্রিয় বোন হোলেনা! এই তুষার ঢাকা বনের মধ্যে আমি কোথায় খুঁজে পাবো স্ট্রবেরি? তুমিই বলো কেউ কি কখনো শুনেছে স্ট্রবেরি তুষার ঢাকা বনের মধ্যে জন্মায়?
“মারুসা, তুমি নিচু শ্রেণির ছোটলোক একটা একটা মেয়ে। যখন আমি তোমাকে কোনো কাজ করার নির্দেশ দেয় তখন তুমি কি করে আমার সঙ্গে তর্ক করার সাহস পাও? আমি বলছি তুমি এক্ষুণি যাও এবং আমার জন্য স্ট্রবেরি নিয়ে আসো। অন্যথায় আমি তোমাকে হত্যা করবো।”
মারুসার সৎমা তাকে শক্ত করে ধরে টানতে টানতে দরজার কাছে নিয়ে এলো এবং দরজায় বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিলো। মারুসা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বনে পথে এগিয়ে গেল। বনের মধ্যে পুরু স্তরের বরফ পড়েছিল এবং কোথাও কোনো মানুষের পায়ের চিহ্ন ছিল না। বনের মধ্যে মারুসা একা একা অনেকক্ষণ এলোমেলো এদিক সেদিক হেঁটে বেড়াল। কিছুক্ষণ পরে সে ক্ষিধায় এবং প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় ক্লান্ত হয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পরে  সে আগের দিনের মতো একটা হালকা আলো দেখতে পেল অনেক দূরের পাহাড়ে। মারুসা আনন্দে আত্মহারা হয়ে ছুটতে শুরু করলো পাহাড়ের দিকে। কোনো দিকে আর তাকিয়ে সে দ্রুত গতিতে চলতেই লাগলো দূরের ওই আলোর দিকে। অনেকক্ষণ হাঁটার পর মারুসা আলোর কাছে পৌঁছে গেল এবং দেখলো সেই আগের মতো আগুনের কুণ্ডলীর চার পাশে ১২টি পাথরের ওপরে বসে আসে বারো জন মানুষ।
মারুসা পাথরের উপরে বসা মানুষগুলোকে উদ্দেশ্য করে বললো, “ভদ্র মহোদয়গণ অনুগ্রহ করে আমাকে একটু সাহায্য করুন, আমার ঠাণ্ডা হাত দুটো গরম করার জন্য আগুনের কাছে আসতে দিন। এই যে দেখুন আমি ঠাণ্ডায় ঠক ঠক করে কাঁপছি।”
সবার উপরে বসে থাকা জানুয়ারি মারুসার দিকে তাকিয়ে বললো, “মেয়ে তুমি আবার কেনো এসেছো এখানে? তুমি এখানে কি খোঁজ করতে এসেছো?”
মারুসা বললো, “আমি স্ট্রবেরি খোঁজ করছি।”
জানুয়ারি বললো, “মেয়ে তুমি নিশ্চয় জানো এখন শীতকাল এবং শীতকালে বরফের উপর স্ট্রবেরি জন্ময় না।
মারুসা দুঃখ ভরা কণ্ঠে বললো, “আমি জানি মহান জানুয়ারি, কিন্তু আমার সৎমা এবং সৎবোন হোলেনা আমাকে নির্দেশ দিয়েছে তাদের জন্য কিছু স্ট্রবেরি নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমি যদি তাদের জন্য স্ট্রবেরি নিয়ে না যেতে পারি তাহলে তারা আমাকে হত্যা করবে। অনুগ্রহ করে আমাকে বলুন পিতা, আমি এই বরফের মধ্যে কোথায় কিছু স্ট্রবেরি খুঁজে পাবো?”
পরম দয়ালু সহানুভূতিশীল জানুয়ারি মারুসার এই কাতর কথাগুলো শুণে উঠে দাঁড়ালো, তারপর ঠিক তার উল্টো দিকের পাথরে বসে থাকা মানুষটির কাছে গেল। সেই মানুষটি নাম ছিলো জুন। দয়ালু জানুয়ারি জুনের হাতে তার হাতের মুগুরটা তুলে দিয়ে বললো, “ভাই জুন, সব থেকে উচ্চ  ওই আসনে গিয়ে বসো”।
জুন দয়ালু জানুয়ারির নির্দেশ মতো সব থেকে উঁচু পাথরটির উপরে গিয়ে বসলো এবং তার হাতের মুগুরটি তরঙ্গায়িতভাবে আগুনের উপরে ঘুরাতে লাগলো। কিছুক্ষণের মধ্যে আগুন আগের থেকে কয়েকগুণ বেশি তেজে জ্বলতে শুরু করলো। উতপ্ত আগুনের তেজে মুহূর্তের মধ্যে বরফ গলে পানি হয়ে গড়িয়ে চলে গেল দূরের নদীতে। বরফ গলে যাওয়ার পরে বনের মধ্যে যত ফাঁকা স্থান ছিল সব সবুজে ভরে গেল। ডালে ডালে সবুজ কচি পাতায় গাছ ভরে গেল। পাখিরা বসন্ত এসে গেছে মনে করে গান গাইতে শুরু করল। ফুলে ফুলে বাগান ভরে গেল। সত্যিই সব বরফ গলে সমস্ত বাগান জুড়ে বসন্ত এসে গেলো। কিছুক্ষণের মধ্যে গুল্ম ঝোপের নিচের মাটি ঢেকে গেলো ছোট ছোট সাদা ফুলে। প্রতি মুহূর্তে স্ট্রবেরি ফুলগুলো স্ট্রবেরিতে রূপান্তরিত হতে লাগল। সবগুলো স্ট্রবেরি একসঙ্গে পাকতে শুরু করলো। এমন দৃশ্য মারুসা আগে কখনো দেখেনি। এমনকি মারুসা আগে কখনো চিন্তাও করেনি। দেখতে না দেখতেই বনের মধ্যে সবখানে একসঙ্গে সবগুলো স্ট্ররেবি পেঁকে গেলো। এই দৃশ্য হঠাৎ করে কেউ দেখলে তার কাছে মনে হবে মাটির উপরে লাল রক্ত ছড়ানো রয়েছে।
মারুসাকে উদ্দেশ্য করে জুন পেছন থেকে বললো “মারুসা, তুমি সবগুলো স্ট্রবেরি তুলে নাও। এগুলো সব তোমার।” মারুসা আনন্দের সঙ্গে স্ট্রবেরি তুলতে লাগলো; যতখন না তার জামার কোচ ভরে না গেলো। স্টবেরি তোলা শেষ হলে মারুসা তার হৃদয়ের সমস্ত ভালাবাসা আর বিনয় দিয়ে উপস্থিত জানুয়ারি, মার্চ ও জুনসহ সকল মাসকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাড়ি পথে রওনা হলো।
মারুসা কোচ ভর্তি স্ট্রবেরি ফল নিয়ে ফিরে আসছে এই দৃশ্য দেখে হোলেনা আর তার মা খুবই অবাক হলো। তারা দৌঁড়ে গিয়ে ঘরের বন্ধ দরজা খুলে দিলো মারুসার ঘরের ঢোকার জন্য। মারুসা ঘরে ঢুকতেই পাকা স্ট্রবেরি ফলের গন্ধে সমস্ত ঘর ভরে গেলো।
হোলেনা মুখ গোমড়া করে মারুসার কাছে জানতে চাইলো, “এইরকম পাকা লাল টুকটুকে স্ট্রবেরি ফলগুলো তুমি কোথায় পেয়েছো?
মারুসা বললো, “বনের মধ্যে উঁচু একটা পাহাড় আছে। সেই পাহাড়ের উপরে দেখতে ছোটখাটো একটা বিচ গাছের নিচে এই রকম রক্তের মতো লাল টুকটুকে স্ট্রবেরি প্রচুর পরিমাণে ধরে আছে। আমি সেখান থেকে এইগুলো নিয়ে এসেছি।”
হোলেনা সবগুলো স্ট্রবেরি মারুসার কাছ থেকে নিয়ে গেল এবং একটার পর একটা খাওয়া শুরু করলো। যতক্ষণ পর্যন্ত স্ট্রবেরিগুলো শেষ না হলো ততক্ষণ পর্যন্ত হোলেনা তার মাকে সঙ্গে নিয়ে খেতেই থাকল। কিন্তু একবারও তারা মারুসাকে একটি স্ট্রবেরিও খেতে বললো না। মারুসা অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলো হোলেনা আর তার মা একের পর এক সবগুলো স্ট্রবেরি খেয়ে ফেললো এবং খাওয়ার পর তার জন্য একটি স্ট্রবেরিও রাখলো না।
হোলেনা যখন তৃপ্তি সহকারে স্ট্রবেরিগুলো খাচ্ছিল, তখন তার আরো অনেক আকর্ষণীয় ও লোভনীয় ফল খেতে মন চাচ্ছিল। ঠিক এর কিছুদিন পরে সে লাল আপেল খাওয়ার জন্য তার মনের ইচ্ছা প্রকাশ করলো। মারুসাকে ডেকে হোলেনা বললো, “মারুসা, আজই তুমি বনে যাও এবং আমার জন্য কিছু পাকা লাল টুকটুকে আপেল নিয়ে আসো।
এই কথা শুনে মারুসা কিছুটা বিরক্ত হয়ে প্রতিবাদের সুরে বললো, “হোলেনা, তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? এটা তো খুবই আজব কথা। তুমিই বলো, এই শীতে বরফে ঢাকা বনের মধ্যে আমি আপেল পাবো কোথায়?”
“মারুসা তুমি নিচু শ্রেণির মেয়ে, একটা ছোট লোক। যখন আমি তোমাকে কোনো কাজ করার নির্দেশ দিলে, তখন তুমি আমার সঙ্গে তর্ক করার সাহস পাও কি করে? যাও, এক্ষুণি বনের দিকে যাও এবং আমার জন্য লাল আপেল নিয়ে আসো। অন্যথায় আমি তোমাকে হত্যা করবো।” হোলেনা ধমকের সুরে বললো।
হোলেনার কথা শেষ না হতেই তার মা মারুসাকে শক্ত করে ধরে টানতে টানতে দরজার কাছে নিয়ে এলো এবং দরজার বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। মারুসা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বনে পথে এগিয়ে গেল। ঠিক আগের মতোই বনের সব স্থানে অনেক পুরু স্তরের বরফ পড়েছিল এবং কোথাও কোনো মানুষের পায়ের চিহ্ন ছিল না। কিন্ত এবার মারুসা বনের মধ্যে একা একা অনেকক্ষণ এলোমেলো এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াল না। সে দ্রুত গতিতে দৌড়াতে দৌড়াতে পাহাড়ের উপরে সেই স্থানে চলে গেল। যেখানে আগুন জ্বলছে। আর সেই আগুনের চারপাশে ১২টি পাথরের উপরে বসে আছে ১২ জন মানুষ। বছরের ১২ মাস। মারুসা আগুনের কাছাকাছি পৌঁছে দেখতে পেল, ১২ জন মানুষ ১২টি পাথরের ওপর বসে আছে। মহান জানুয়ারি আগের মতোই বসে আছে সব থেকে উঁচু পাথরটির উপরে।
মারুসা আগের মতো পাথরের উপরে বসা মানুষগুলোকে উদ্দেশ্য করে বললো, “ভদ্র মহোদয়গণ, অনুগ্রহ করে আমাকে একটু সাহায্য করুন, আমার ঠাণ্ডা দুটো হাত গরম করার জন্য আগুনের কাছে আসতে দিন। এই যে দেখুন, আমি ঠাণ্ডায় ঠক ঠক করে কাঁপছি। আমি সম্ভবত ঠাণ্ডায় জমে মরে যাবে।”
সবার উপরে বসে থাকা জানুয়ারি মারুসার দিকে তাকালো এবং বললো “মেয়ে তুমি আবার কেন এখানে এসেছো? তুমি এবার কি খোঁজ করতে এসেছো?”
মারুসা বললো “প্রিয় পিতা, আমি লাল আপেল খোঁজ করছি।”
জানুয়ারি বললো, “মেয়ে তুমি নিশ্চয় জানো, এখন শীতকাল এবং শীতকালে বরফের উপর কোনো আপেল গাছেই আপেল ধরে না।
মারুসা দুঃখ ভরা কণ্ঠে বললো, “আমি জানি পিতা, কিন্তু আমার সৎমা আর তার মেয়ে হোলেনা আমাকে নির্দেশ দিয়েছে তাদের জন্য কিছু লাল আপেল নিয়ে যেতে। আমি যদি তাদের জন্য লাল আপেল নিয়ে না যাই তাহলে তারা আমাকে হত্যা করবে। অনুগ্রহ করে আমাকে বলুন পিতা, আমি এই বরফের মধ্যে কোথায় খুঁজে পাবো কিছু লাল আপেল?”
পরম দয়ালু সহানুভূতিশীল জানুয়ারি মারুসার এই কাতর কথাগুলো শুনে উঠে দাঁড়ালো, তারপর  তার  থেকে একটু দূরে পাথরের উপরে বসে থাকা একটি বয়স্ক মানুষের কাছে গেল। এই মানুষটির নাম সেপ্টেম্বর। পরম দয়ালু জানুয়ারি বৃদ্ধ সেপ্টেম্বরের হাতে তার কাঠের মুগুরটা তুলে দিয়ে বললো, “ভাই সেপ্টেম্বর ওই যে ওখানকার সব থেকে উঁচু পাথরটির উপরে গিয়ে বসো”।
বৃদ্ধ সেপ্টেম্বর দয়ালু জানুয়ারির নির্দেশ মতো সব থেকে উঁচু পাথরটির উপরে গিয়ে বসলো। জানুয়ারির দেওয়া কাঠের মুগুরটি হাতে ধরে তরঙ্গায়িতভাবে মুগুরটি আগুনের উপরে ঘুরাতে লাগলো। কিছুক্ষণের মধ্যে আগুনের তেজ বেড়ে গেল। আগুনের লাল শিখা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। আগুনের তাপ এমন বাড়ল যে চারপাশের বরফ গলতে শুরু করলো। কিন্তু এবার কোনো গাছের ডাল কচিপাতায় পাতায় ভরে গেল না। শুধু গাছের পুরানো পাতাগুলো বাতাসে দুলতে দুলতে মাটিতে পড়তে লাগলো একের পর এক। এলোমেলো ঠাণ্ডা বাতাস ঝরে যাওয়া সেই পাতাগুলো উড়িয়ে নিয়ে তৈরি করলো হলুদ পাতায় ঢাকা এক পাহাড়। সেই সময় মারুসা কোনো গাছেই কোনো ফুল দেখতে পেল না। সে শুধু দেখলো পাহাড়ের উপরের শেষ দিকে ফুটে আছে লাল এবং গোলাপি কিছু ফুল আর পাহাড়ের উপত্যকায় তৃণভূমিতে ফুটে আছে জাফরান ফুল। দ্রুত বর্ধনশীল ফার্নগাছ এবং ঘন সবুজ লতানো গাছ লক-লকিয়ে বেড়ে উঠছে বিচ গাছের নিচে। কিন্তু মারুসা এসবের কিছুই দেখল না। সে শুধু খুঁজছিল লাল আপেল। অবশেষে অনেক দূরে সে একটা আপেল গাছ দেখতে পেল। অনেকক্ষণ তাকিয়ে সে দেখতে পেল কয়েকটি লাল আপেল ঝুলছে গাছের সব থেকে উঁচু ডালে।
সেপ্টেম্বর পেছন বলে উঠল “মারুসা, আপেল গাছ ধরে একবার ঝাঁকি দাও।”
আনন্দে আত্মহারা মারুসা সেপ্টেম্বরের কথা মতো আপেল গাছে ঝাঁকি দিল। আর অমনি গাছের উঁচু ডাল থেকে একটা লাল আপেল নিচেই পড়ল। মারুসা দ্বিতীয়বার আপেল গাছে ঝাকি দিল এবং এবার আরো একটি আপেল ঝরে পড়ল।
পেছন থেকে সেপ্টেম্বর চিৎকার করে বললো, “মারুসা এখন এই আপেল দুটো নিয়ে দ্রুত দৌড়ে বাড়ি ফিরে যাও।
মারুসা মাথা নিচু করে তার মনের গভীর থেকে সেপ্টেম্বর মাসসহ অন্য সকলের প্রতি বিনীত ধন্যবাদ জানালো। তারপর আপেলগুলো কুড়িয়ে নিয়ে মনের আনন্দে দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ি ফিরে এলো।
হোলেনা এবং তার মা মারুসার হাতে আপেল দেখে খুবই অবাক হলো। তারা দৌড়ে গিয়ে বন্ধ ঘরের দরজা খুলে দিল মারুসার ঘরে ঢোকার জন্য। ঘরে ঢুকেই মারুসা আপেল দুটো হোলেনা আর তার মাকে দিয়ে দিল।
হোলেনা মারুসার কাছে জানতে চাইলো, “মারুসা, তুমি কোথায় পেলে এমন সুন্দর লাল টুকটুকে আপেল?”
মারুসা বললো, “বনের মধ্যে যে উঁচু পাহাড় আছে সেখানকার আপেল গাছে এই রকম আপেল অনেক ধরে আছে”।
হোলেনা মারুসাকে নিষ্ঠুর গলায় বললো, “তাহলে কেন তুমি শুধু দুটো আপেল নিয়ে এলে? আরো অনেক আপেল নিয়ে আসা তোমার উচিত ছিল। নাকি তুমি বন থেকে আসতে আসতে অন্যগুলো খেয়ে ফেলেছো?
মারুসা প্রতিবাদ করে বললো, “অবাক করলে প্রিয় বোন আমার! বন থেকে ফিরে আসার পথে আমি একটি আপেলও খায়নি। আমি যখন প্রথমবার গাছে ঝাঁকি দিয়েছিলাম তখন একটা আপেল পড়েছিল। আবার যখন দ্বিতীয়বার ঝাঁকি দিয়েছিলাম তখনও একটি আপেল পড়েছিল। দ্বিতীয় আপেলটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওখানকার মানুষেরা আমাকে আর একবার আপেল গাছে ঝাঁকি দিতে বলেনি। বরং, তারা চিৎকার করে বলেছে, দুটো আপেল নিয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরে আসতে। তাই আমি শুধু দুটো আপেল নিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছি।”
এই কথা শুনে হোলেনা মারুসাকে অভিশাপ দিতে শুরু করলো: বললো, “এই অন্যায় কাজের জন্য খুব সম্ভবত অচিরেই বজ্রপাতে তোমার মৃত্যু হবে!” এই বলে হোলেনা মারুসাকে মারতে শুরু করলো।
মারুসা দুঃখে কষ্টে কাঁদতে শুরু করলো এবং সে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলো অচিরেই যেন তার মৃত্যু হয়। তা না হলে সম্ভবত তার সৎমা এবং বোন হোলেনা তাকে হত্যা করবে। সে উদ্‌ভ্রান্তের মতো দৌড়ে গিয়ে রান্নাঘরের কোনায় পালালো।

লুভি হোলেনা মারুসাকে অভিশাপ দেওয়া বন্ধ করে আপেল খাওয়া শুরু করলো। হোলেনা তার মাকে বললো, এই আপেল স্বাদ অসাধারণ। এর আগে সে জীবনে কখনো এমন অসাধারণ সুস্বাধের আপেল খাইনি। হোলেনার মাও মেয়ের সঙ্গে সুর মিলিয়ে একই মত পোষণ করলো। যখন তারা আপেল খেয়ে শেষ করেলো, তখন তাদের আরো আপেল খাওয়ার আগ্রহ বেড়ে গেল। কিন্তু তাদের কাছে আর আপেল নেই।
হোলেনা তার মাকে বললো, “মা আমার ভেড়ার পশম দিয়ে তৈরি কোটটা দাও। আমি নিজেই আজ আপেলের সন্ধানে বনে যাবো। ওই লুভিটাকে আর পাঠাবো না। এই ছোট লোক মেয়েটা বন থেকে আপেল সংগ্রহ করে বাড়ি আসার পথে সে আবার সবগুলো মজাদার আপেল খেয়ে ফেলবে। আমি ঠিক ঠিকই সেই জায়গাটা খুঁজে বের করতে পারবো। যেখানে আপেল গাছে অনেক লাল টুকটুকে আপেল ধরে আছে। আমি ঠিকই সেই আপেল গাছে ঝাঁকি দিয়ে সবগুলো আপেল পেড়ে নিয়ে আসব। যতই পেছন থেকে কেউ চিৎকার করুক আমি থামবো না।”
হোলেনার মা তাকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করলো কিন্তু তাতে কোনো লাভ হলো না। হোলেনা তার পশমের কোটটা গায়ে দিলো, মাথায় টুপি দিল এবং গলায় জড়িয়ে নিলো লম্বা একটা গরম কাপড় এবং তার মায়ের কোনো কথা না শুনে, কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা বনের দিকে চলতে শুরু করলো সে। হোলেনার মা অবাক হয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো কিভাবে হোলেনা ঠাণ্ডা আবহাওয়ার মধ্যে বরফের ওপর দিয়ে হেঁটে যায়।
বনের সব স্থানে অনেক পুরু স্তরের বরফ পড়েছিল এবং কোথাও কোনো মানুষের পায়ের চিহ্ন ছিল না। মিষ্টি লাল টুকটুকে আপেল পাওয়ার আশায় হোলেনা বনের মধ্যে একা একা অনেকক্ষণ এলোমেলো এদিক সেদিক হেঁটে বেড়াল। অবশেষে সে দেখতে পেল অনেক দূর পাহাড়ের উপরে একটা আলো জ্বলছে। হোলেনা সেই আলোর দিকে এগিয়ে গেল এবং পাহাড়ের ঠিক উপরে যেখানে আলো জ্বলছে সেখানে উঠল। দেখলো আগুনে চারপাশে ১২ পাথরের উপরে ১২ জন মানুষ বসে আছে। এই দৃশ্য দেখে হোলেনা সামান্য ভয় পেল কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সে নিজেকে সামলে নিল।
হোলেনা সরাসরি আগুনের দিকে এগিয়ে গিয়ে কোটের ভেতর থেকে হাত বের করলো। গরম করার জন্য আগুনের উপর মেলে ধরলো ঠাণ্ডায় জমে যাওয়া হাত। কিন্তু ১২ মাসের উদ্দেশ্যে “একটু সরে বসে আমাকে একটু জায়গা দেবেন” এই কথাটুকু পর্যন্ত বললো না। এমনকি সে কারো সঙ্গে কোনো কথায় বললো না।
মহানুভব দয়ালু জানুয়ারি কিছুটা রেগে গিয়ে প্রশ্ন করলো, “তুমি কে এবং তুমি কেনো এখানে এসেছো? তুমি এখানে কি খোঁজ করছো?
হোলেনা রাগান্বিত কণ্ঠে উত্তর দিল, “বোকা বুড়ো, তুমি কেন জানতে চাও, আমি কে এবং কেন এখানে এসেছি? আমাকে নিয়ে মাথা ঘামিয়ে তোমার কোনো কাজ নেই। এই বলে হোলেনা আগুনের কুণ্ডলী থেকে তার হাত সরিয়ে নিল এবং বনের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
হোলেনার এই রকম আচরণ মহানুভব জানুয়ারির পছন্দ হলো না। সে তার হাতের মুগুরটা তরঙ্গায়িতভবে মাথার উপরে ঘুরাতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশ ঘন অন্ধকারে ভরে গেল। আগুনের আঁচ অনেক কমে গেল। আগুনের আঁচ কমার সঙ্গে সঙ্গে এমন পুরু তুষার পড়তে শুরু করল তা দেখতে ঠিক ঝাঁকি দেয়া তোশক থেকে বের হয়ে আসা তুলার মতো। বনের মধ্যে বরফ ঝড় বইতে শুরু করল। হোলেনা তার সামনের কিছু্‌ই আর দেখেতে পারছে না, বনের মধ্যে সে পথ হারিয়ে ফেললো। এই অবস্থায় সে বহুবার তুষারের গাদার উপর ধাক্কা খেল। কিছুক্ষণ পরে তার শরীর দুর্বল হয়ে গেল এবং হাত পায়ের আঙ্গুলগুলো শক্ত হয়ে গেল। তুষার পড়তেই থাকলো এবং ঠাণ্ডা বাতাস বইতে লাগলো। আবহাওয়া আগের থেকে আরও ঠাণ্ডা হয়ে গেল। এমন বিপদের মুহূর্তে হোলেনা মারুসাকে অভিশাপ দিতে শুরু করলো এবং তার এই পরিস্থিতিতে সৃষ্টিকর্তাকে দোষারোপ করতে লাগলো। গায়ে পশমের কোট থাকা সত্ত্বেও তার হাত-পায়ের আঙ্গুলসহ শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঠাণ্ডায় জমে গেল।
হোলেনার মা হোলেনার জন্য বাড়িতে অপেক্ষা করছিল, সে একদৃষ্টিতে তাকিয়েছিল জানালা দিয়ে। কখনো বা দরজার বাইরে এসে তাকিয়ে ছিল বনে যাওয়া পথের দিকে। কিন্তু অনর্থক হলো এই তাকিয়ে থাকা।
“হোলেনার কি আপেলগুলো খুব বেশি পছন্দ হয়েছে? যে কারণে সে আসতে পারছে না। অথবা তার কি হয়েছ? আমার অবশ্যই তা দেখা উচিত” এই কথা বলে হোলেনার মা সিদ্ধান্ত নিল, অবশ্যই সে নিজে গিয়ে দেখবে তার মেয়ে কোথায় কি অবস্থায় আছে। সুতরাং, আর দেরি না করে সে তার কোট গায়ে দিল। গলায় এবং মাথায় সাল জড়িয়ে নিল এবং হোলেনাকে খুঁজে বের করার জন্য সে বেরিয়ে পড়ল। বনের মধ্যে পুরু মোটা স্তরের তুষার পড়ে আছে। কোথাও কোনো মানুষের পায়ের চিহ্ন নেই। দ্রুত গতিতে তুষার পড়তে লাগলো এবং বনের মধ্যে ঠাণ্ডা বাতাস বইতে শুরু করলো। আগের থেকে আরো অনেক বেশি জোরে বাতাস বইতে থাকলো।
এদিকে মারুসা সবার জন্য রাতের খাবার রান্না করলো। সে গরুগুলোর দেখাশোনা করলো এবং খাবার দিল। তখনো হোলেনা আর মা ফিরে আসলো না। মারুসা চিন্তা করলো, “তারা এতক্ষণ কোথায় অপেক্ষা করছে?” আর কোনো কাজ না পেয়ে মারুসা কাটিমে সুতা ভরতে শুরু করলো। এক সময় কাটিমে সুতা ভরা শেষ হলো এবং তার কিছুক্ষণ পরেই ঘরের ভিতরটা আগের থেকে অনেক বেশি অন্ধকার হয়ে গেল। কিন্তু তখনো হোলেনা এবং তার মা ফিরে এলো না।
মারুসা কান্না করে বললো, “হায় ঈশ্বর! তারা কখন আসবে?” মারুসা আতংকিতভাবে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলো। মারুসা দেখলো, বাইরের আকাশ অনেক পরিষ্কার এবং চারদিকটা বেশ উজ্জ্বল আলোয় ভরা। কিন্তু কোথাও কোনো মানুষের দেখা মিললো না... হঠাৎ করে মারুসা ঘরের জানালা বন্ধ করে দিল।
সে নিজেকে সান্ত্বনা দিল এবং তার সৎমা এবং বোনের জন্য প্রার্থনা করলো... সকাল বেলায় সে অনেকক্ষণ নাস্তা নিয়ে অপেক্ষা করলো তার সৎমা এবং বোনের জন্য। দুপুরে অপেক্ষা করলো এবং রাতেও অপেক্ষা করলো। এইভাবে দিনের পর দিন রাতে পর রাত সে অপেক্ষা করলো কিন্তু কোনো লাভ হলো না। না তার সৎমা না তার  সৎবোন; কেউই আর ফিরে আসলো না। তারা উভয়ই ঠাণ্ডায় জমে মারা গেছে বনের মধ্যে।
যেহেতু তার সৎমা এবং বোন আর ফিরে এলো না সুতরাং মারুসা তাদের বাড়ি, বাড়ির সঙ্গে লাগানো চাষের একখণ্ড জমি এবং কিছু গরুর মালিক হলো। কিছুদিন পরে সুদর্শন ও উত্তম চরিত্রের এক যুবক কৃষকের সঙ্গে তার বিবাহ হলো এবং তারপর তারা দুজনে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগল।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

আপনার মতামত দিন

এক নারী দেহরক্ষীর গোপন জীবন

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যে তথ্যগুলো জানা দরকার

রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে রাখার মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে এগোচ্ছে সরকার: ফখরুল

ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ তিতাসের ৮ কর্মকর্তাকে দুদকে তলব

‘বাংলাদেশে এখনও জঙ্গি হামলার ঝুঁকি রয়েছে’

সাকিবের চতুর্থ উইকেট

দুই পার্সেলে ২০৮ কেজি ’খাট’

দুটি আন্তর্জাতিক অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

সাবেক তিন খেলোয়াড়কে ফ্ল্যাট দিলেন প্রধানমন্ত্রী

জনগণের বিরুদ্ধে নয়, কল্যাণে আইন করতে হবে

পুলিশের লাঠিচার্জে জোনায়েদ সাকি সহ আহত অর্ধশত (ভিডিওসহ)

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে স্বাক্ষর না করতে প্রেসিডেন্টের প্রতি অনুরোধ

খালেদার অনুপস্থিতিতেই চলবে বিচার কাজ

গণমাধ্যমের হাত-পা বেঁধে ফেলতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন : রিজভী

চাপ, হুমকির মুখে দেশ ত্যাগ করেছি (ভিডিওসহ)

বন্দরে বৃদ্ধের লাশ উদ্ধার