ভ্রমণ

কর্নেল মে’র শহর

ঈদ আনন্দ ২০১৮

কাফি কামাল | ২৮ জুন ২০১৮, বৃহস্পতিবার
Pyin-u-lwin, a charmingly situated village of some five and twenty houses, with a market-place and a gambling ring, won our hearts.  Herbert White: A Civil Servant in Burma
বার্মার শান সীমানার কাছাকাছি একটি শৈল শহর পিন উ লউইন। শান পর্বতমালার শীর্ষদেশে কিছু শান বসতিকে কেন্দ্র করে ১৮৬৬ সালে বৃটিশ বাহিনী একটি কৌশলগত সামরিক চৌকি স্থাপন করেছিল এ শহরে। ১৮৮৬ সালে বৃটিশ আর্মি ৫ম বেঙ্গল ইনফেন্ট্রির গ্যারিসন প্রতিষ্ঠা করে পিন উ লউইনে। পিন উ লউইনকে সামরিক ঘাঁটি হিসেবে গড়ে তোলার কারিগর ছিলেন সে গ্যারিসনের কমান্ডার কর্নেল জেমস মে। পরে তার নামানুসারে শহরটির নামকরণ করা হয় মেমিও বা মে টাউন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিরাপদ পরিবেশ ও সুলভ আবাসন সুবিধার কারণে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটেছে পিন উ লউইনে। বার্মায় পা রেখেই পশ্চিমা পর্যটকরা ছুটে যান সেখানে। রেঙ্গুন বিমানবন্দরে নেমে মান্দালয় যাবার আগ্রহের কথা শুনে বন্ধুবর মোরশেদ শহরটির হদিস দিয়েছিল।
আজ সে শহরে যাবো ছুটভ্রমণে। সন্ধ্যামুনি প্যাগোডা থেকে ছুটলাম পিন ও লউইনগামী বাস স্টেশনে। আমার গাইড প্রকাশ ভার্মা যখন মান্দালয়ের সিক্সটি স্ট্রিটের পাই গাই মায়েত শিন হাইওয়ে বাস স্টেশনে (Pyi Gyi Myet Shin Highway Bus Station) নিয়ে গেল তখন ল্যাসিওগামী একটি বাস তখন ইঞ্জিন চালু অবস্থায় দৌড়ের প্রস্তুতি দম নিচ্ছিল। চালকের সঙ্গে বার্মিজ ভাষায় কথা বলে আমাকে সে বাসে তুলে দিলেন প্রকাশ ভার্মা। বহুদিনের পরিচিতের মতো বুকে জড়িয়ে ধরে বিদায় জানালেন। মান্দালয় থেকে পিন ও লউইন বাস ভাড়া তিন হাজার কিয়াট। মধ্যখানের একটি সিটও মিলে গেল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই শুরু হলো যাত্রা। পিন উ লউইনের অবস্থান মান্দালয় শহর থেকে ঊনসত্তর কিলোমিটার পূর্বে। কিন্তু পূর্বদিকে উঁচু পাহাড়ের কারণে দক্ষিণে ঘুরে যেতে হয়। মান্দালয় থেকে দক্ষিণমুখী বিশ কিলোমিটারের মতো এগিয়ে পূর্ব-উত্তরমুখী চলে গেছে লাসিও অভিমুখী মেমিওর রাস্তা। গতিময় বাস। বিশ কিলোমিটার যাবার পর শুরু হলো পাহাড়ি পথ। মান্দালয় থেকে ল্যাসিও পথে ঘণ্টাখানেক বাসযাত্রার পর হঠাৎ পাল্টে গেল পথদৃশ্য। শান পর্বতমালার একটি পাহাড়ের শরীর বেয়ে সবুজ বনানীর মধ্যদিয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে উপরের দিকে উঠে গেছে রাস্তা। সহজেই চোখে পড়ে কয়েক বাঁক উপরে বা নিচ দিয়ে ছুটে চলা যানবাহন। দার্জিলিং-নেপালের পাহাড়ি রাস্তার মতো একই পাহাড়ে রাস্তা চক্কর কাটে কয়েকবার। অন্যরকম এক রোমাঞ্চ স্নায়ুতে শিহরণ জাগায়। এ রাস্তা দিয়ে চলার সময় আমার মালয়েশিয়ার গ্যান্টিং হাইল্যান্ডের কথা কথা মনে পড়লো। জায়গাটির নাম একুশ মাইল। সেখান থেকে কয়েক কিলোমিটার এগোলে রাস্তাটি আবার এঁকেবেঁকে উঠে গেছে আরও উপরের দিকে, আকাশের পানে। দীর্ঘ পাইনগাছগুলোর মধ্যখান দিয়ে তীর্যকভাবে এগিয়ে যাওয়া রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় মনে হলো বাস ভ্রমণেরও এক ধরনের মজা আছে। পথে পড়ল ইয়াতানারপন। যেখানে সাইবার সিটি গড়ে তুলছে বার্মিজ সরকার। কাছেই আনিসাকানে রয়েছে একটি সামরিক বিমানবন্দর।
বাসের টিভিতে চলছে বার্মিজ কমেডি চলচ্চিত্র। বাগান থেকে মান্দালয় আসার দিন কাউন্টারে বসে দেখেছিলাম বার্মিজ যাত্রা। সেটা ছিল আমার কাছে দারুণ বিরক্তিকর এক বিষয়। কিন্তু বার্মিজ এ কমেডি ছবিটার মধ্যে মজা পাওয়া যাচ্ছে। আমি কিছুক্ষণ ছবি দেখছি, কিছুক্ষণ চোখ মেলে দিচ্ছি বার্মার প্রকৃতি দর্শনে। বাসে তুলে দেয়ার সময় প্রকাশ ভার্মা ড্রাইভারকে বলে দিয়েছিল। আমাকেও আশ্বস্ত করে বলেছিল, সঠিক জায়গায় নামিয়ে দেবে। বাসের সুপারভাইজারের কাছে একবার প্রশ্ন করলাম, আর কতদূর? লোকটি মুখের হাসির রেখা ফুটিয়ে ইশারায় অপেক্ষা করতে বললেন। পিন উ লউইন যখন গাড়ি পৌঁছালো তখন ছুটি হয়েছে স্কুল। রাস্তার দুইপাশে বাড়ি ফিরতি শিক্ষার্থীদের সারি। বাসটি একটি মন্দিরের সামনে গিয়ে থামলে বুঝতে পারি গন্তব্যে পৌঁছেছি। প্রকাশ ভার্মা এ কৃষ্ণ মন্দিরটির কথাই বলে দিয়েছিলেন। মন্দির চত্বরে পা রাখতেই আমাকে বিদ্ধ করল কয়েক জোড়া চোখ। মন্দির চত্ব্বরে বসে একজন ঠিক করছিলেন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম। অন্যজন দাওয়ায় বসে পাশে দাঁড়ানো এক প্রবীণের সঙ্গে কথা বলছিলেন। প্রকাশ ভার্মা নিশ্চয়তা দিয়ে বলেছিল, আপনি মন্দিরে গেলেই সুলভে বিশ্বস্ত গাইড পাবেন। আমি নিজের পরিচয় দিয়ে বললাম, আমি ঘুরতে এসেছি- এখানে কি কোন গাইড পাওয়া যাবে। যে লোকটি বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ঠিক করছিলেন তিনি বললেন, একটু অপেক্ষা করুন। লোকটির নাম শ্যাম। মন্দিরের সেবায়েত। শ্যাম জাতিগতভাবে গোর্খা। বৃটিশ সেনাবাহিনীর গোর্খা রেজিমেন্টের কোনো এক সৈনিকের উত্তরাধিকারী। আমি শ্যামকে বললাম, হাতে সময় কম, দেখার ইচ্ছা অনেক কিছু। আপনিই বলুন, অল্প সময়ে কোথায় যাওয়া যায়। শ্যাম বলল, ঝর্ণা দেখতে হলে একদিন অপেক্ষা করতে হবে। সেটা শহর থেকে কিছুটা দূরে। রেলসেতুটিও ল্যাসিও পথে। তারজন্য আরও একদিন অবস্থান দরকার। আপনি বরং শহর এবং বোটানিক্যাল গার্ডেনটিই দেখে যান। বাংলাদেশ থেকে বেড়াতে গিয়েছি শুনে তাদের তিনজনই দেখলাম আমার ব্যাপারে উৎসুক। গল্প করতে করতেই তাদের পেছনে রেখে আমি দু’টি সেলফি তুললাম। যে লোকটি দাঁড়িয়েছিলেন তিনি বলে উঠলেন, এই মুছো মুছো। আমি বিস্ময়াবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইলাম। পরক্ষণে সেলফিগুলো মুছে ফেললাম। লোকটির নাম আয়ার। ভারতবর্ষের মাদ্রাজি বংশোদ্ভূত হিন্দু। ছবি মুছে ফেলার পর লোকটি হনহন করে বেরিয়ে গেলেন। লোকটি বেরিয়ে যেতেই শ্যাম বলল, তুমি মুসলিম; তারউপর বাংলাদেশি সাংবাদিক। তোমার সঙ্গে তোলা নিরাপদবোধ করেনি। বুঝে নিলাম, দেশ যখন বার্মা, যে কাউকে নিরাপত্তাহীনতা তাড়া করতেই পারে।  
আমরা ছুটলাম খান্ডাউজি ন্যাশনাল বোটানিক্যাল গার্ডেনে। সার্কুলার রোড হয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছলাম গার্ডেনে। খাউন্ডজি লেকটির দক্ষিণপ্রান্তটি প্রশস্ত আর উত্তরপ্রান্তটি সংকুচিত। লেকের উত্তরপ্রান্ত দিয়ে পূর্বপাশ থেকে পশ্চিমপাশের উদ্যানে যেতে হয়। বাইকটি পার্কিং লটে রেখে টিকিট কাউন্টারের দিকে এগোতে এগোতে শ্যাম জানালেন, বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর বোটানিকাল গার্ডেনগুলোর একটি হিসেবে খ্যাতি আছে এটির। পিন উ লউইন পর্বত শ্রেণীর শীর্ষ দেশে খান্ডাউজি লেককে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয়েছে এ উদ্যান। ১৯১৫ সালে ১৭৭ হেক্টর জমির উপর বাগানটি তৈরি করেন বৃটিশ বন কর্মকর্তা আলেক্স রজার। সৌখিন বাগানবিদ লেডি কুর্দি এ কাজে আলেক্সকে সহযোগিতা করেছিলেন। ১৯১৭ সালে বাগানটি সরকারি স্বীকৃতি পায় এবং ১৯২৪ সালে সংরক্ষিত বাগান হিসেবে গণ্য করে সরকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বাগানটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয় প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়। ২০০০ সালে খান্ডাউজি ন্যাশনাল বোটানিক্যাল গার্ডেন নামকরণের পর গার্ডেনটি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয় বার্মা সরকার। শ্যাম বলল, আগে সরকারি নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু দুর্নীতির কারণে এখন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে বার্মার অন্যতম প্রধান ট্যুরিস্ট স্পটে পরিণত হওয়া এ উদ্যানে এখন টিকিট কেটে ঢুকতে হয়। গার্ডেনকে কেন্দ্র করে বেশকিছু হোটেল রিসোর্ট তৈরি হয়েছে। আছে মন্দির, মসজিদ, প্যাগোডা আর চার্চ। আছে আমিউজ পার্ক। বোটানিক্যাল গার্ডেনটি বেশ সাজানো গোছানো। গার্ডেনের ভেতরে মোটরবাইক নেয়া যায় না। বাধ্য হয়ে হাঁটলাম, সত্যি বলতে কি ছুটলাম।
লেকের মধ্যখানে একটি ছোট্ট বৌদ্ধ মন্দির। ভারত বর্ষে দেখেছি, পাহাড়, নদীর মোড়, পুরো বটগাছ সবকিছুর পাশেই একটি মন্দির গড়ে তুলেছে। বার্মার ব্যাপারটিও অনেকটাই তেমন। মন্দিরের পাশদিয়ে লেকের ওপর দিয়ে রয়েছে পারাপারের কাঠের সেতু। সে সেতুতে দাঁড়িয়ে দর্শনার্থীরা লেকের মাছের খেলা দেখে। সেখানে কার্ফ জাতীয় প্রচুর মাছ জলে ঘাই দিয়ে, পরস্পরের সঙ্গে গুতোগুতি করে। মাছের এ খেলা দর্শনার্থীদের আনন্দ দেয়। লেকের জলে ভেসে বেড়ায় রাজহাঁসের দল। গার্ডেনের ভেতরে রয়েছে ফুলের দোকান। ফুলের তৈরি একটি ঘড়ি। ঘড়িটিকে পেছনে রেখে পর্যটকদের ছবি তোলার ধুম পড়ে। আর বয়সি পর্যটকরা বাম্বু ক্যাফেতে আয়েশ করে কফিতে চুমুক দিতে দিতে চোখ মেলে দেয় প্রকৃতির পানে। প্রতিবেশী দেশের জাতীয় বোটানিক্যাল গার্ডেনের বিশুদ্ধ হাওয়ায় ফুসফুসকে সতেজ করতে করতে কফিতে দু’টো চুমুক না দিলে কি চলে। বাম্বু ক্যাফের দিকে ইশারা করে শ্যামকে বললাম, চলো- চুমুকে চাঙা হই। শ্যাম না করে না।  

টলটলে স্বচ্ছজলের প্রাকৃতিক জলাশয় এ খান্ডাউজি লেক। শ্যাম বলল, বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার আগে বন্ধুদের নিয়ে তিনি লেকের পাড়ে কাটিয়েছেন বহু পূর্ণিমা রাত। চাঁদের আলোয় লেকের সৌন্দর্য নাকি অবর্ণনীয়। খান্ডাউজি লেকের পাড়ে হাঁটার সময় আমার ভাবনায় উঁকি দিয়ে গেল চট্টগ্রামের ফয়েস লেক। পাহাড়ের হৃদয়ে সঞ্চিত কী অসাধারণ একটি লেক। কিন্তু আমরা সে পাহাড়কে করেছি ন্যাড়া, লেককে দূষিত আর পরিবেশকে অস্বস্তিকর।
বোটানিক্যাল গার্ডেনের একজন কর্মকর্তাকে দেখে এগিয়ে গিয়ে বার্মিজ ভাষায় কিসব যেন বললেন শ্যাম। বুঝাই যাচ্ছে তারা দীর্ঘদিনের পরিচিত, বন্ধুও হতে পারে। ইশারায় আমাকে ডেকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি আমাদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে অকির্ড গার্ডেন পর্যন্ত এগোলেন। যেতে যেতে বললেন, গার্ডেনে ৫১৪ প্রজাতির স্থানীয় জাতের ও ৭৫ প্রজাতির বিদেশী বৃক্ষ, ৭৫ প্রজাতির বাঁশ ও ৭৫ প্রজাতির পাতাবাহার, ঐতিহ্যগত ঔষধি গাছ ও নানাধরনের গুল্ম রয়েছে। ১৯৪২ সালে এ উদ্যানে সংগ্রহ করা হয়েছিল ১৭৮ প্রজাতির অর্কিড। গার্ডেনে নানা জাতের ফুলের বাগান। বোটানিক্যাল গার্ডেনে লেকের পাড়ে প্রচুর ফুলের বাগান করা হয়েছে। সব সময় ফুল ফুটে। গার্ডেনে হাজার হাজার জাতের গাছ। পরিকল্পিত জঙ্গল। গিবন, টাকিন, এন্টিলোপসহ নানা জন্তু-জানোয়ার রয়েছে এখানে। জাতীয় উদ্যানের প্রতি পর্যটকদের আগ্রহ বাড়াতে সেখানে তৈরি করা হয়েছে বৃক্ষ ফসিল, অর্কিড, কাঠ ও প্রজাপতির চারটি মিউজিয়াম। একটি উন্নতমানের রেশম চাষ কেন্দ্র ও ঐতিহ্যগত ঔষধি উদ্ভিদেরও বড় গবেষণা কেন্দ্রও গড়ে তোলা হয়েছে বোটানিক্যাল গার্ডেনে।
লেকের উত্তর-পশ্চিম কোনায় উদ্যানের মধ্যেই রয়েছে নান মাইইন্ট ওয়াচ টাওয়ার। লেকপাড় থেকেই দেখা যায় গার্ডেনের ওয়াচ টাওয়ারের শীর্ষ দেশ। আমরা সেদিকে হাঁটি কিন্তু পথ পুরোয় না। সূর্য ঢলে পড়েছে পশ্চিমে। যখন ওয়াচ টাওয়ারে পৌঁছালাম ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে সেটা। তবুও টাওয়ারের নিচে পাহারাদের আবাসস্থলে উঁকি মারলাম। পাহারাদের একজনকে বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আমি আজ রাতেই রেঙ্গুন চলে যাব। তোমাদের দেশে আবার কবে আসা হবে তা তো অনিশ্চিত। খুবই আনন্দিত হবো যদি একটু টাওয়ারে চড়তে দেন। পাহারাদার সদয় হলেন। পনের মিনিট সময় বেঁধে দিয়ে বললেন, দ্রুত নেমে আসবেন।
অনুমতি পেতে দেরি ওয়াচ টাওয়ারের গাত্রবেয়ে ঊর্ধ্বমুখী কাঠের সিঁড়ি ভাঙতে দেরি নেই। চারদিকে সবুজের ঢেউ। পাখির কুজন। নান মাইইন্ট ওয়াচ টাওয়ার তৈরি করা হয়েছে ২০০৩ সালে। ২১৫ ফুট উঁচু। প্রায় দশতলার সময় উঁচুতে অবজারভেটরি ডেক। টাওয়ারের ডেকে দাঁড়ালে মেমিও শহরের একাংশে নজরে আসে। দূরে পাহাড়ের গায়ে ছোট ছোট ভবন। প্রকৃতির ঠাণ্ডা বাতাস ও পাখির কলকাকলির শব্দে প্রাণ ও শরীর জুড়িয়ে যায়। এমন বিশুব্ধ প্রাণবায়ু সত্যিই সঞ্জিবনী। পাহাড়, আকাশ, ঝর্ণা এখানে মিলেমিশে একাকার। পিন উ লউইন নৈসর্গিক সৌন্দর্য সত্যি অসাধারণ। ফেরার পথে তরুণ পাহারাদারটিকে কিছু টাকা দিতে চাইলাম। তরুণটি তা গ্রহণে বিনয়ের সঙ্গে অস্বীকার করল।
Instead of building airy colonial bungalows, the British put up street after street of red-brick mansions with mock Tudor facades and strategic privet hedges- middle-class dream homes rising from the jungles of South-East Asia. journalist Andrew Marshall
শান পর্বতমালায় অবস্থিত মেমিও শহরে বর্তমানে আড়াই তিন লক্ষ মানুষের বসবাস। শহরটির পুরোনো নাম- থাউং লে খার (পাহাড়ের সিঁড়ি), থাউং সা কান (পাহাড়ী শহর), পান ময়ু তাউ (ফুলের শহর) ও রেমিও। বৃটিশরা যখন পিন উ লউইন আবিষ্কার করে তখন সেখানে দুই ডজন বাড়ি, একটি ছোট্ট বাজার ও একটি গোলচত্বর ছিল। যা তাদের মন জয় করে নিয়েছিল। বৃটিশ সেনা কর্মকর্তা কর্নেল মে’র হৃদয়ও জয় করে নিয়েছিল এ শৈল গ্রাম। কর্নেল মে ১৮৮৬ থেকে ১৯০৪ পর্যন্ত ২০ বছর অবস্থান করেছেন এ শহরে। পাশের জঙ্গলে ছিল একটি চম্বুকের পাহাড়।  মেমিও তৈরি হয়েছিল সামরিক ঘাঁটি হিসেবে। কয়েক বছরের মধ্যেই মান্দালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয় রেল যোগাযোগ। তারপর গ্রীষ্মকালে সেখানেই পরিচালিত হতে শুরু করে বৃটিশ বার্মার রাজকর্ম। কিছুদিনের মধ্যেই সেখানে গোর্খা ও ভারতীয় ডিভিশনের সমন্বয়ে স্থাপন করা হয় বৃটিশ বাহিনীর বার্মা ডিভিশনের হেড কোয়ার্টার। নেপালি গোর্খাদের বড় একটি আবাসস্থলে পরিণত হয়। বিশেষত শহরটির স্বাস্থ্যকর আবহাওয়ার কারণে এখানে গড়ে তোলা হয় একটি শৈল শহর। সী লেভেল থেকে ১০৭০ মিটার উচ্চতায় দার্জিলিং ও সিমলার মতো গ্রীষ্মকালীন স্বাস্থ্যকর শৈলশহর। কারণ ঘনবৃক্ষরাজি ও পাহাড়ি চূড়ায় হওয়ার কারণে শীতল ও স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষ উপযোগী এ শহরের আবহাওয়ায়। যা হয়ে উঠেছিল বৃটিশ-বার্মার গ্রীষ্মকালীন রাজধানী। বার্মার (সিভিল, বাণিজ্যিক ও সামরিক) এর প্রতিষ্ঠাতা কর্নেল মে’র নামে শহরটির নাম হয় মেমিও। পিন উ লউইনকে বলা হয় মিলিটারি টাউন। হার্ভেট হোয়াইট রচিত- ‘এ সিভিল সার্ভেন্ট ইন বার্মা’ গ্রন্থের মধ্যে শহরটির প্রাথমিক অবস্থার বর্ণনা গ্রথিত আছে। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক জর্জ অরওয়েল বৃটিশের ইন্ডিয়ান ইম্পেরিয়াল পুলিশের কর্মকর্তা মেমিওতে ট্রেনিং নেন। ১৯২২ থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর সেখানে কর্মরত ছিলেন। মেমিওতে পুলিশের কর্মকর্তা থাকাকালে জর্জ অরওয়েল তার ‘বার্মিজ ডে’ উপন্যাসের অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। তিনি তার ‘হোমেজ টু কাতালোনিয়া’ উপন্যাসে বর্ণনা করেছেন মেমিও সে দিনগুলোর কথা। বৃটিশ শাসনের কারণে এ শহরে বসতি স্থাপন করে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অ্যাংলো-বার্মিজ, ভারতীয় হিন্দু-মুসলিম ও নেপালী গুর্খা। পরের অর্ধশতাব্দি ধরে বৈচিত্র্যময় জাতিগোষ্ঠীর বসবাসে, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে জৌলুস বেড়েছে মেমিও’র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একটি বড় ধরনের সামাজিক ধাক্কা লাগে এ শহরে। এ সময় হাজার হাজার অ্যাংলো-বার্মিজকে গ্রেপ্তার করে পাঠানো হয়েছিল কারাগারে। ১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহের একজন সেনাপতি ও বঙ্গীয় রেজিমেন্টের কমান্ডার সাময়িকভাবে ১৮৮৭ সালে শহরে অবস্থানকালে শহরটি বার্মিজ নামকরণ করেন পিন উ লউইন। ষাটের দশকে বার্মায় সামরিক জামানা শুরু হলে শহরের নাম পরিবর্তন করে পুনঃপ্রবর্তন করা হয় পিন উ লউইন। বৃটিশ লেখকরা বহুগ্রন্থে বর্ণনা করেছেন পিন উ লউইনের রূপ-রস। তার মধ্যে রয়েছে- বেথ ইলিসের ‘এন ইংলিশ গার্লস ফার্স্ট ইমেপ্রশন অব বার্মা’ (Beth Ellis - An English Girl’s First Impression of Burma),  পল থিরাক্সের ‘দ্য গ্রেট রেলওয়ে বাজার: বাই ট্রেন থ্রু এশিয়া’ (Paul Theroux, The Great Railway Bazaar: By Train Through Asia).
বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে ফেরার পথে চীনা প্যাগোডায় নিয়ে গেল শ্যাম। একটি রঙিন ও চাইনিজ বাড়ির ধাচের ক্যাঙ। নাম চান তাক। চীনের ইউনান থেকে অভিবাসী হয়ে এ শহরে স্থায়ী হওয়া লোকজন নির্মাণ করেছে অনিন্দ্য সুন্দর এ প্যাগোডা। চাইনিজ ক্যাঙয়ের আপনাকে স্বাগত জানাবে বিশাল বপুর বুদ্ধ মূর্তি। আঙিনায় ফোয়ারার মধ্যখানে ময়ুরপঙক্ষীর মতো জোড়াপঙক্ষীর উপর বসে আছেন আরেক বুদ্ধ মূর্তি। আছে উঁচু ও সুদৃশ্য ওয়াচ টাওয়ার। একপাশে দেয়ালের সঙ্গে লাগোয়া কিছু মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে চীনা ধাচের। তার মধ্যেই ঢুকে পড়েছে গণেশের মতো এক মুর্তি, যার কান দুটো কুলোর মতোন। পাশেই ইংলিশ সিমেট্রি। শ্যাম জানান, যেখানে শুয়ে আছেন বহু বৃটিশ সৈনিক ও তাদের বংশধর। বার্মার সামরিক জান্তা ক্ষমতায় আসার পর এ কবরখানার প্রতি সরকারি মনোযোগ হারিয়ে যায়। সমাধি ফলকের লেখাগুলো বেশিরভাগই নষ্ট করে দেয়া হয়। ফলে হারিয়ে যায় বৃটিশদের বহু যুদ্ধ, ধ্বংস ও নির্মাণের ইতিহাস। তবুও ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার মতো কিছু ফলক এখন টিকে আছে এ সমাধি ক্ষেত্রে। রাস্তার উল্টো পাশেই সেন্ট জেমস চার্চ। এককালের অ্যাংলিকান চার্চটি এখন রূপান্তরিত হয়েছে ক্যাথলিক চার্চে। বার্মায় এসেই বাগান ঘুরতে গেছে জেনে শ্যাম বলল, বাগান আসলেই স্পেশাল। নানা দেশের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা তীর্থে আসেন বাগান-মান্দালয়ে। পিন উ লউইনে তীর্থযাত্রীদের ভিড় জমে না। এখানে একটি প্যাগোডাই রয়েছে মহা অ্যান্ট হটকি কান থার। যে ক্যাঙ নির্মাণ নিয়ে মিথ আছে। বলা হয়, মান্দালয়ে পাথর কেটে তিনটি মুর্তি গড়ার পর সেগুলো নেয়া হচ্ছিল চীনে। পথে এ মূর্তিটি বাহন থেকে পড়ে যায়। কিন্তু কিছুতেই মূর্তিটি আর বাহনে তোলা যাচ্ছিল না। এত ওজন যে সেটা অনেকে মিলেও তুলতে পারছিল না। পরে স্থানীয় এক বৌদ্ধ ভিক্ষু সাতদিন স্থানীয়দের মূর্তিটি পাশে বসে ধর্মপাঠ দেন। তারপর মূর্তিটি বর্তমান স্থানে স্থানান্তর করা হয়। মূর্তিটিকে একটি বিশেষ উপহার হিসেবে বিবেচনা করে স্থানীয় বৌদ্ধরা।

ঈদের দিনটি কাটাতে চাই রেঙ্গুনে। রাতের গাড়িতে তাই রেঙ্গুন ফিরব। শ্যামকে বলে রেখেছিলাম টিকিটের কথা। চীনা প্যাগোডা থেকে ফেরার পথে আমাকে একটি মুদি দোকানে নিয়ে গেল শ্যাম। অবাক হয়ে বললাম, বাসের টিকিট কাটতে মুদি দোকানে নিয়ে এলেন! তিনি স্মিত হাসলেন। মাথা নাড়িয়ে বললেন, ইয়েস স্যার। মুদি দোকানেই মেলে বাসের টিকিট। ফের জিজ্ঞেস করলাম, নিশ্চয়ই লোকাল বাস। তিনি এবার সশব্দে হেসে বললেন, ভরসা রাখুন। দোকানে বসে আছেন এক প্রৌঢ়া। তিনি গন্তব্য কোথায় জিজ্ঞেস করলেন বার্মিজ ভাষায়। শ্যাম বললেন, রেঙ্গুন। রেঙ্গুন শব্দটি উচ্চারণের পর বুঝলাম ভদ্রমহিলা গন্তব্য জানতে চেয়েছিলেন। এরপর তিনি মোবাইলে টিকিটের খোঁজ নিলেন। পরক্ষণে বাসের সিটপ্ল্যান বের করে আমাকে দেখিয়ে বললেন, ল্যাসিও থেকে যাত্রী বেশি তাই সিট হবে পেছনের দিকে। একেবারে পেছনে নয়, অন্তত চারসিট আগে। সিট প্ল্যান দেখে আমার মাথা ঘুরে গেল। এতো একেবারে উন্নতমানের এসি বাসের সিটপ্ল্যান। টিকিটের দাম রাখলেন ১৪ হাজার কিয়েট। নিঃসন্দেহে স্বল্পমূল্য। টিকিট পকেটে ভরে শ্যাম আমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। পাশেই একটি রাস্তার পাশে বাইক থামিয়ে বললেন, দেখেন মুসলমানদের মাদরাসা। মুসলিম বিদ্বেষী বার্মার মধ্যপূর্বাংশের এ পাহাড়ি শহরে আরবি ও বার্মিজ বর্ণমালায় লেখা মাদরাসাটি দেখে আমি অবাক হলাম।
শ্যাম বৃটিশ গুর্খা সৈনিকের বংশধর। পিন উ লউইনের জাতিগত সমপ্রীতির কথা বলতে গিয়ে শ্যাম গর্বের সঙ্গেই বললেন, এ শহরের উন্নতির পেছনে আমাদের অবদান আছে। আমরা তাই এখানে মাথা উঁচু করেই চলি। গোটা বার্মাজুড়ে যখন অস্বস্তিত্বে মুসলমানরা তখন বার্মিজ, চীনা, কাচিন, কারেন, শান সমপ্রদায়ের মানুষের সঙ্গে মোটামুটি স্বস্তিতে দিন কাটাচ্ছেন পিন উ লউইনের মুসলমানরা।
মাদরাসা ঘুরে আমরা গেলাম কৃষ্ণ মন্দিরে। শ্যামকে দেখেই এগিয়ে এলেন মন্দিরের পুরোহিত। শ্যাম আমার পরিচয় দিয়ে বললেন, বেড়াতে এসেছে। পুরোহিত আমাদের ভোগের লাড্ডু দিলেন।
কথায় কথায় পূর্বপুরুষদের অবদানের দাবি উচ্চারণে গৌরববোধ করেন শ্যাম। বলে, এখনও পিন উ লউইনয়ে রয়েছে শিক্ষাদীক্ষায় একটি উন্নত ইউরেশীয় সমপ্রদায়ের বসবাস। বেসিক এডুকেশন হাই স্কুলের সামনে দিয়ে যাবার সময় শ্যাম বলল, ঔপনিবেশিক আমল থেকেই  সেন্ট মেরি, সেন্ট মাইকেল, সেন্ট অ্যালবার্র্ট, সেন্ট জোসেফ কনভেন্ট ও কোলগেটের জিইএসএইচএস (সরকারি ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয়) নিয়ে মেমিও ছিল বার্মার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র। বৃটিশ উপনিবেশিকরা তাদের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য যে স্কুলগুলো প্রতিষ্ঠা করেছিল স্থানীয়রাও পেয়েছে সেগুলোর সুফল। এককালে এ শহরে ছিল সব জাতিগোষ্ঠীর জন্য উন্মুক্ত সামরিক শিক্ষার বিভিন্ন স্কুল। বর্তমানে ক্যান্টনমেন্টসহ বার্মার ডিফেন্স সার্ভিসেস অ্যাকাডেমি (ডিএসএ) ও ডিফেন্স সার্ভিসেস টেকনোলজি একাডেমী (ডিএসটিএ) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এ শৈল শহরে।
আমাদের এবারের যাত্রা শহরের গভর্নর হাউজ। ১৯০৩ সালে নির্মিত ভবনটি ১৯০৫ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত ছিল বৃটিশ গভর্নরের সরকারি বাসভবন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ সালে জাপানিদের বোমা হামলায় ভবনটি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। দীর্ঘ ছয়দশক পর ২০০৫ সালে পুরনো ভবনের ছবি অনুযায়ী নতুন করে নির্মাণ করা হয় গভর্নর হাউজ। ঐতিহাসিক ভবনটি এখন শহরের একটি ব্যয়বহুল হোটেল। পুরো গভর্নর হাউসটি এক রাতের ভাড়া দেড় হাজার মার্কিন ডলার। গভর্নর হাউজ থেকে আমরা ছুটলাম পারসেল টাওয়ার। পিন উ লউইনের রাস্তায় বাইক চালাতে শ্যাম বলে যান, এ শহরের, এই সার্কুলার রোডে আশেপাশে ঔপনিবেশিক আমলের বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক বাড়ি, রেস্ট হাউজ। যেগুলো বর্তমানে হোটেল ও টুরিস্ট লজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯০৪ সালে বম্বে-বার্মা ট্রেডিং কর্পোরেশনের গেস্ট হাউজ হিসেবে নির্মিত হয়েছিল চান্দাকরাইগ ঔপনিবেশিক প্রসাদ। বর্তমানে যেটির নাম থিরি মায়িং হোটেল। বিখ্যাত লেখক পল থ্রোক্সের লেখা গ্রেট রেলবাজার গ্রন্থে রয়েছে এ হাউজের তৎকালের দারুণ সুন্দর বর্ণনা। পরিত্যক্ত বাড়ি হিসেবে বেশ কয়েক বছর পড়ে থাকার পর ২০১৫ সালে প্রাসাদটির সংস্কার করা হয়। বাইরে থেকে দেখতে প্রাসাদটিকে মনে হয় একটি টেবিল টেনিস প্লেট। শহরের আর দুইটি খ্যাতনামা ঔপনিবেশিক বাড়ি হচ্ছে দ্য ক্রসটন ও ক্রাড্ডক কোর্ট। ক্রাড্ডক কোর্ট টি এখন নান মাইয়াং হোটেল, ক্রসটন এখন গ্রান্ডামার মাইয়াং হোটেল। হোটেল, রেস্ট হাউজগুলোতে রাত কাটালে আপনি পুরনো মডেলের গাড়িতে চড়ার শখ পূরণ করতে পারেন। পিন ও লউইন শহরে আপনার চোখে পড়বে কেবিনযুক্ত প্রচুর ঘোড়ার গাড়ি। আর  প্রচুর বাইক। মাথায় পাথাল দিয়ে লোকজন সাইকেল চালিয়ে ছুটে যাচ্ছে গন্তব্যে। মেয়েরা সাইকেল চালাচ্ছে স্বাচ্ছন্দ্যে।
শহরের মোড়ে মোড়ে ফুলের দোকান। ক্ষেত থেকে সদ্য তুলে আনা নানা রকম ফলফলাদি ঝুলছে দোকানে। শ্যাম বলেন, পিন উ লউইনের অর্থনীতির বড় উৎসই কৃষি। বাণিজ্যিকভাবে ফুল, কমলা, স্ট্রবেরি, আনারস ও কফি চাষের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে প্রচুর ডেইরি ফার্ম। বার্মার প্রধান ফুল উৎপাদন কেন্দ্র পিন উ লউইন। বসন্তকালে রাস্তার দুইপাশে ফুলের দোকান গড়ে উঠে। দেশের বড় শহরগুলোতে মেমিও থেকে ফুল সরবরাহ হয়। মেমিও’র বিখ্যাত দ্রব্য হচ্ছে সোয়েটার, কফি দানা ও স্ট্রবেরি জেলি। চারটি প্রধান দ্রষ্টব্য হচ্ছে- ঝর্ণা, গুহা, বোটানিক্যাল গার্ডেন ও স্ট্রবেরি ফার্ম, কমলা বাগান, কফি বাগান। পর্যটকরা স্ট্রবেরির স্বাদ এবং ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন।
মান্দালয়-ল্যাসিও মহাসড়কের পাশেই শহরের একেবারে হৃৎপিণ্ডে পারসেল টাওয়ারের অবস্থান। বিগবেনের অনুকরণে পিন উ লউইনের স্থাপন করা হয়েছিল পারসেল টাওয়ার। বৃটেনের রাজা পঞ্চম জর্জ-এর রাজত্বের সিলভার জুবিলির স্মরণে গিলেট ও জনসন কোম্পানি ১৯৩৪ সালে ঘড়িটি তৈরি করেছিল। পারসেল টাওয়ারকে বলা হয় মোইমোর ল্যান্ডমার্ক। শহরের সবচেয়ে পুরনো এবং অভিজাত মোড় এটি। বিগবেন বা ঢাকার রাজউক ভবনের মতো ঘড়ির পেন্ডুলাম দুলছে এখানে। পারসেল টাওয়ারের ঘড়িটার কাঁটায় যেন বাজে মেমিও শহরের ইতিহাসের শ্বাস-প্রশ্বাস।
পারসেল টাওয়ারের পাশেই মুসলিমদের একটি সরাইখানা। মোমেন ফ্রি হোটেল। শ্যাম জানালো, এখনো সহজে সুলভে মুসলমানরা এ সরাইখানার অতিথি হতে পারেন। আমি সে ভবনটির দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম। আমার মনে পড়লো, চট্টগ্রাম মুসলিম হলের পাশের এককালের সরাইখানাটির কথা। ছোটবেলা থেকেই সরাইখানার সাইনবোর্ডটি দেখলে আমার মনে নানা কৌতূহল তৈরি হতো। আজ মেমিও শহরের সরাইখানা সে শৈশবের কথা মনে করিয়ে দিলো। পারসেল টাওয়ারের পাশেই সুভ্যেনিরসহ নানা চীনা-বার্মিজ পণ্যদ্রব্যের দোকান। দোকানগুলো চাইনিজ ও থাই দ্রব্যে সাজানো। সেখানে বেশকিছু ভারতীয় মিষ্টান্নের দোকান চোখে পড়লো। শ্যাম আমাকে বলে, গোটা বার্মাজুড়ে রয়েছে পিন উ লউইনের হাতেবোনা স্যুয়েটারের কদর। সুভ্যেনির হিসেবে বিদেশিরাও কিনে নিয়ে যায় চড়া দামে। পরিবারের সদস্যদের জন্য দু’য়েকটি নিয়ে যেতে পারো। কিন্তু ততক্ষণে আমার চোখ পড়েছে অন্যখানে। পারসেল টাওয়ারের উল্টো পাশের দোকানে জটলা করছে মাথায় হিজাব পরিহিত কিছু তরুণী। আমার বিস্ময় উপচে পড়ছে। বার্মিজ বংশোদ্ভূত মুসলিম এত সুন্দর। শ্যাম বললো, কি মুগ্ধ হলেন বুঝি! আমার ঘোর কাটলো। শ্যাম মুখে হাসি ফুটিয়ে বললো, এটি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা।    
শ্যাম বললো, পিন ও লউইনে সবচেয়ে ভালো ভারতীয় রেস্টুরেন্টটির নাম আউং পাদমি রেস্টুরেন্ট। পারসেল টাওয়ারের কাছে শান মার্কেটের উল্টো দিকে। আমি খাদক নই, খুব আগ্রহও নেই বিখ্যাত রেস্টুরেন্টের ব্যাপারে। বললাম, স্ট্রিট ফুডেই আমার পছন্দ। পিন ও লউইনে রাস্তার পাশে প্রচুর স্ট্রিট ফুডের দোকান। ছাঁচে ফেলে ছোট ছোট চিতই পিঠা, ডিম পিঠা, রুটি আর চাপাতিসহ নানা রকমের পিঠা বানিয়ে বিক্রি করছেন নারীরা। শূকরের মাংস, মুরগির ঠ্যাং, চা-বিড়ি তো আছেই। লুচিও মেলে। চাইনিজ-বার্মিজ খাবারের সঙ্গে ভারতীয় ও মোগল খাবারের সমন্বয়ে একটি অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে পিন উ লিউইনে। পারসেল টাওয়ারের কাছেই রাস্তার পাশে তেমন একটি স্ট্রিট ফুডের দোকানে গিয়ে বসি। চালের রুটির সঙ্গে ঘরোয়া মুরগির মাংসসহ খাবার অর্ডার করি। আমার অতি সংক্ষিপ্ত এ ভ্রমণ নিয়ে হা-হুতাশ করে শ্যাম। বলে, অন্তত দুটি দিন সময় নিয়ে যদি আসতেন। আমি সাধ্যহীন মানুষের মতো আনমনে মুখের রেখায় ফুটিয়ে তুলি আক্ষেপের হাসি।
বার্মিজ তরুণী এসে টেবিলে খাবার দিয়ে যায়। শ্যাম তাকে বার্মিজ ভাষায় কি যেন বলে। মেয়েটি শব্দ করে হেসে উঠে। তার হাসির চমকে আমি কুঁকড়ে যাই। আমার কুঁকড়ে যাওয়া চেহারা দেখে শ্যাম যেন মজা পায়।  
আমি বললাম, গুচ্ছ প্রপাতের একটি ঝর্ণা আছে না পিন উ লউইনে, সেটি কতদূর? শ্যাম বলে, পিন উ লউইনে এসে রেল সেতু, ঝরনা আর গুহা না দেখলে তোমার আক্ষেপ কাটবে না ইহকালে। সময় নিয়ে এলে তোমাকে নিয়ে যেতাম আনিসাকান ও পিউই কাউক জলপ্রপাতে। পিউই কাউক, বৃটিশ আমলে যেটার নাম ছিল হ্যাম্পশায়ার ফলস। পিন ও লউইন থেকে ২০ কিলোমিটার পূর্বে ল্যাসিও সড়কে আছে পেইক চিন মাউং গুহা। এটি বার্মিজদের একটি জনপ্রিয় পিকনিক স্পট। পেইক চিন মায়ং কেভ অত্যন্ত সুন্দর ঝরনা ও গুহা। পেইক ঝরনার সৌন্দর্য পর্যটকদের ভ্রমণের সব ক্লান্তি দূর করে দেয় নিমেষেই। ঝরনার পেছনে রেখে ছবি তোলার জন্য রয়েছে ছোট্ট ব্রিজ। পর্যটকরা ঝরনায় নেমে শরীর ভিজিয়ে বা গোসল করে নিতে পারে। ভ্রমণ পিপাসুরা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বন-জঙ্গল মারিয়ে সে জলপ্রপাতে যায়। ঝরনার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে ভ্রমণের সব ক্লান্তি নিমিষেই দূর হয়ে যায়। ল্যাসিওর পথে ট্যাক্সিতে করে সহজে যাওয়া যায়। কাছেই উই নাইং গু এবং পাইক চিন মাইং গুহা। মগয়ুপিট, ইয়েচানদো, ইয়ে নেগইয়ে- শানগ্রামগুলো ঘুরিয়ে দেখাতাম।  
ল্যাসিওর পথে গৎউইন প্রবাহের উপরে আছে ঐতিহাসিক গোকতেইক ভায়াডাক্ট বা রেলসেতু। ঔপনিবেশিক আমলের রেলসেতুটি ৬৭৯ মিটার দীর্ঘ ও ২৭০ মিটার উঁচু। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্টিল ফ্রেমের রেলব্রিজ। রেলব্রিজের বিবেচনায় টেকনিক্যাল দিক থেকে একটি মাস্টারপিস বিবেচনা করা হয়।  ১লা জানুয়ারি ১৯০০ সালে রেল সেতুটির উদ্বোধন হয়। শতবর্ষ পুরনো এ সেতু দিয়ে প্রতিদিন দুইটি ট্রেন যাতায়াত করে মান্দালয় থেকে ল্যাসিও। এ রেলসেতু ভ্রমণ যেকোনো পর্যটকের জন্যই দারুণ এক অভিজ্ঞতা।
শ্যাম প্রশ্ন করলো, আপনি নিশ্চয়ই পাহাড়ি শহর, ফুলের শহর এসব শুনেই পিন উ লউইনে এসেছেন। আমি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ি। শ্যাম বললো, দিন দিন বদলে যাচ্ছে এ শহর। ওষুধ কারখানা, কফি কারখানাসহ গড়ে উঠেছে নানা শিল্পপ্রতিষ্ঠান। স্বৈরশাসনের প্রকৃত অবসান হলে এবং জাতিগত বিদ্বেষের বিষবাষ্প উড়ে গেলে আসিয়ানের মধ্যে সবচেয়ে শক্ত অর্থনীতির ভিত তৈরি হবে বার্মার। বিংশ শতকের দেশ দুই দশকে এ শহরে ইউনান থেকে প্রচুর চীনা অভিবাসী স্থায়ী হয়েছেন এ শহরে। তারা ব্যবসা ছাড়া কিছুই বুঝে না। অবশ্যই বার্মার যে বিশাল ভূমি এবং প্রাকৃতিক রিসোর্স রয়েছে তাতে শ্যামের এ দাবিকে উড়িয়ে দেয়ার উপায় নেই।
শ্যাম বললো, ট্রেন স্টেশন থেকে আপনি মান্দালয়, সিপাও ও ল্যাসিও যেতে পারেন। মান্দালয় থেকে এ শহরে প্রতিদিন দুইটি ট্রেন যাতায়াত করে। ট্রেনের ভাড়া খুবই কম। ট্রেনে ভ্রমণ করলে আপনি দেখতে পাবেন বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক রেলসেতু গকটেইক। বললাম, রেঙ্গুনে ঈদ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছি বার্মা। রেঙ্গুনে ঈদ পালনের অনুভূতি মিস করতে চাই না। তোমার সব তথ্য সঞ্চয় করে রাখছি মগজের কোষে। যদি কোনোদিন সুযোগ পাই পইপই করে ঘুরবো তোমাদের দেশ।  
মেমিও এ শহর ঘুরে দেখার জন্য সবচেয়ে কার্যকর বাহন হচ্ছে ঘোড়া বা মোটরবাইক। পিন উ লউইনের রাস্তায় রাস্তায় সাঁটানো একটি নিরাপত্তা বার্তা। কিছুদূর পর পর আপনার চোখে পড়ছে। ‘ফলো ট্রাফিক রুল, সেভ লিভস। লাইফ ইজ এ জার্র্নি, কমপ্লিট ইট। ইউর সেফটি আওয়ার এইম, ইউর কমপোর্ট আওয়ার রেওয়ার্ড।’ রেঙ্গুন থেকে রাতের বাসে রওনা দিলে ভোরে পিন উ লউইন পৌঁছাবেন। চাইলে ল্যাসিও বা সিপাও ভ্রমণের পথে নামতে পারেন এ শহরে। মেমিও থেকে যেতে পারেন বার্মার অন্যতম দ্রষ্টব্যস্থান ইনলে লেক। পিন উ লউইনের কাছাকাছি আনিসিকানের সামরিক বিমানবন্দরটি সর্বসাধারণের জন্য নয়, তাই মান্দালয় থেকে সড়ক ও রেলপথই ভরসা। আপনি চাইলে সুলভ ভাড়ায় বাইসাইকেল ও মোটরসাইকেল পাবেন। দিন চুক্তিতে ঘোড়ার গাড়ি নিয়েও ঘুরতে পারেন পছন্দের জায়গাগুলো। উঁচু পাহাড়ের গায়ে অপরূপ সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হওয়ার মতো। মনমাতানো এ দৃশ্য স্মৃতিতে অম্লান থাকবে বহুদিন। ঐতিহাসিক এ শৈল শহরে পশ্চিমা পর্যটকদের আনাগোনাই চোখে পড়ে বেশি।
মে’র শহরে একটি চক্কর কাটার পর শ্যাম নিয়ে দাঁড় করালো রাস্তার এক মোড়ে। সেখানে থেকেই গাড়িতে তুলে দিলো। বাসে তুলে দেয়ার সময় করমর্দন করতে গিয়ে আমার হাতটি কিছুক্ষণ চেপে রাখলেন শ্যাম। বললেন, সুযোগ পেলে আবার আসবেন। আবার এলে, অবশ্যই নভেম্বর আসবেন- বেলুন উৎসবে। জানি না কখনো পা রাখা হবে কিনা পিন উ লউইনে, তবু মাথা নাড়লাম। বাস ছাড়ার পর ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে শুরু করলো মেমিও শহর। পাহাড়ি পথ দিয়ে পেছিয়ে পেছিয়ে নামার সময় অদ্ভুত এক অনুভূতির ভেতর দিয়ে কখন যে চোখ জুড়ে রাজ্যের ঘুম নেমে এলো টেরই পেলাম না। রাত এগারোটার দিকে যখন ঘুম ভাঙলো তখন গাড়ি এসে পৌঁছেছে মাইকটিলা। নিচে নেমে কিনে নিলাম সিম বীচি ও সিদ্ধ বাদাম।
মেইখাতিলায় প্রচুর মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, প্রকৃতি বিশ্বাসী সকলে একসঙ্গে মিলেমিশে শান্তিপূর্ণভাবে ব্যবসা ও বসবাস এখানে। শান্তি ও সমপ্রীতির সেই দিনগুলো আর নেই। হারিয়ে গেছে জাতিগত বিদ্বেষের বিষবাষ্পে। ২০১৩ সালে মুসলিমদের সঙ্গে দাঙ্গায় জড়িয়ে পড়েছিল উগ্রপন্থি বর্মীরা। তাদের প্রচারণার নানা উপলক্ষ আছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উপলক্ষ হয় বৌদ্ধ নারীকে ধর্ষণের গুজব। এই রাজনৈতিক অস্থিরতার পেছনে মূলে যারা, তার ক্ষুদ্র বুদ্ধির মানুষকে উস্কে দেয়। রক্ত এবং ক্ষোভ হচ্ছে তাদের তুরুপের তাস। মিয়ানমারে একটি কথা চালু আছে- যখন সুচি বা প্রেসিডেন্ট বিদেশ ভ্রমণে যায় তখন দাঙ্গা হয়। আর যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ অতিথি মিয়ানমার ভ্রমণে আসে, তখনই দাঙ্গা সংঘটিত হয়। আরাকানে বার্মিজ বাহিনীর জাতিগত নির্মূলের নির্মমতা যারা দেখেছেন তারা সহজেই উপলব্ধি করতে পারবেন বার্মিজ সরকার কেমন অমানবিক ও একরোখা।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

আপনার মতামত দিন

এক নারী দেহরক্ষীর গোপন জীবন

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যে তথ্যগুলো জানা দরকার

রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে রাখার মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে এগোচ্ছে সরকার: ফখরুল

ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ তিতাসের ৮ কর্মকর্তাকে দুদকে তলব

‘বাংলাদেশে এখনও জঙ্গি হামলার ঝুঁকি রয়েছে’

সাকিবের চতুর্থ উইকেট

দুই পার্সেলে ২০৮ কেজি ’খাট’

দুটি আন্তর্জাতিক অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

সাবেক তিন খেলোয়াড়কে ফ্ল্যাট দিলেন প্রধানমন্ত্রী

জনগণের বিরুদ্ধে নয়, কল্যাণে আইন করতে হবে

পুলিশের লাঠিচার্জে জোনায়েদ সাকি সহ আহত অর্ধশত (ভিডিওসহ)

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে স্বাক্ষর না করতে প্রেসিডেন্টের প্রতি অনুরোধ

খালেদার অনুপস্থিতিতেই চলবে বিচার কাজ

গণমাধ্যমের হাত-পা বেঁধে ফেলতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন : রিজভী

চাপ, হুমকির মুখে দেশ ত্যাগ করেছি (ভিডিওসহ)

বন্দরে বৃদ্ধের লাশ উদ্ধার