গল্প

ভাঙা বাসাটা

ঈদ আনন্দ ২০১৮

দিলরুবা আহমেদ | ২৮ জুন ২০১৮, বৃহস্পতিবার
সচিত্রকরণ: সুমন রহমান
কেকা আন্টি অনেকক্ষণ ধরেই চেয়ে আছেন, চেয়ে চেয়ে দেখছেন। চোখ বড় বড় করে কড়কড়ে চোখে চেয়ে দেখছেন। এভাবে দেখে থাকা ঠিক না। মাম বলেছেন, চোখ গোল গোল করে কাউকে গিলে খাওয়া খুবই অনুচিত। জেন্টলি মানুষের দিকে তাকাতে হয়। ভদ্রভাবে।
ভদ্রভাবে তাকানোতে প্রকাশ পায় কে কোন বংশের ছেলে। বাপী শুনেই সঙ্গে সঙ্গে বলে দিয়েছিলেন, বড় বড় চোখ করে তাকাবি, যেন খেয়ে ফেলবি এখনি, গপ  করে। তোর এক তাকানোতেই যেন সামনের সব কিছু থমকে দাঁড়ায়।
মাম একথা শুনেই বাপীর দিকে ভয়ংকর একটা চোখ করে চেয়েছিলেন কিছুক্ষণ। না না কিছুক্ষণ না, অনেকক্ষণ। তারপরে বলেওছিলেন কত কি কচু কথা, যেমন তুমি কচু জানো, তোমাকে কচুকাটা করা দরকার। অনেক কিছু বলেছিলেন। বাপী শুনেওনি ঠিকভাবে একটা কথাও। উল্টো তাকেই বলেছেন, দেখ দেখ তোর মা আমার দিকে চেয়ে আছে কিভাবে। এভাবেই চেয়ে থাকতে হয়। আর যা বলছেন ওগুলো কটু কথা নয়, ওগুলো হলো কচু কথা। অনেক শুনেছি, কতবার যে শুনেছি। সে চেয়েও থাকতো ঐভাবে যখন আমি গাছের উপর উঠে বসে থাকতাম। মামও সঙ্গে সঙ্গেই রাগী রাগী গলায়, অথচ সে বুঝতে পারতো রেগে নেই মোটেও, বলতেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ ওভাবেই তো একদিন গাছে থেকে টপকে পড়ে দৌড়ে এসে দাঁড়িয়েছিল, বলেছিল দড়ি গলায় দিয়ে ঝুলে পড়বে যদি না আমি তাকে বিয়ে করি, এই বলে দেখিয়ে দিয়েছিল একহাত লম্বা একটা বামন গাছকে। যে গাছের ডালে বসেছিল সেটাতে আর ঝুলতে চায়নি কিন্তু। বলে মাম এরপর হঠাৎ অনেকক্ষণ হেসেওছিলেন। বাপী উল্টো দিকে ঘুরে হাসতে হাসতেই বলেছেন, চেনাও চেনাও ছেলেকে এই চার পাঁচ বছর বয়সেই চিনিয়ে দাও বামন গাছ তালগাছ সব। দরকার মতন সেও ঝুলে পড়ুক কোন গাছে বা মেয়ের চুলে। বাপী আর মামের মাঝে বসে একবার ডানে আরেকবার বায়ে চেয়ে চেয়ে কথা শুনছিল। বলেওছিল, আমিও মাম এর জন্য ঝুলবো। বাপী যা করতে চেয়েছে আমিও তাই করবো। তার বলা এ কথাটা সে বহুবার বড় হয়েও শুনেছে। এখন তো সে বড়ই। সাত বছর তো প্রায় শেষ হয়েই গেল বলে। সবাই তার ঐ কথা তুলে এখনও হাসে। মাম কিন্তু রাগ করলেই তারপরও বাসায় থাকা বনসাই গাছটা দেখিয়ে তাদের বাপ ছেলেকে বলতো যা দুজনে ঐ গাছের নীচে গিয়ে বসে থাক। ভাত পাবি না। তবে এ বাসা থেকে যাবার সময় মাম গাছটা নিয়ে গেছেন। বলেছেন, ওটা না নিয়ে গেলে বাপী সারাক্ষণ ঐ গাছে ঝুলে দোল খাবে, দোলনা না লাগিয়েই। গাছটা লম্বায় তার হাঁটুর সমান। ওতে দোল খাবে কিভাবে!!  প্রথমে সম্ভবত বলতো, ঝুলে যাবে, পরে বলতো ঝুল খাবে, দোল খাবে। কী যে করবে সে জানে না।  কেকা আন্টি এখনও চেয়ে আছে, ভ্রু কুচকে। বাপী তো  চিৎপাট হয়ে ঘুমাচ্ছেন। হরিদা কাকু চলে যাচ্ছেন দেখে তার পিছু পিছু দরজা পর্যন্ত এসেই এখন পড়েছে কেকা আন্টির ঝুড়িতে। পাল্লায়। হরিপদ কাকু না গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। বাপীর সেক্রেটারি। সব কাজ করে বাপ্পীর। মাঝে মাঝে ময়না ফুপু কাজে না এলে হরিপদকাকু ভাতও রান্না করে দেন। বাপী ঐ সবের কিছুই পারে না। মিকা আন্টিও করে দেয়। মাম বলেন তোর বাপীর এখন দেড় জোড়া বাবুর্চি। সবাই মিলে খাইয়ে ওকে ফুটবল বানাতে চাইছে। বাস্ট হবে সহসা তোর বাপ। তখন খুব জোরে শব্দ হবে, সাবধানে থাকিস। কিন্তু সেরকম হচ্ছে না। দিনে-দিনে নাকি তালপাতার সেপাই হচ্ছেন। এটাও মাম এর কথা। মায়ের অনেক কথাই সে বুঝে উঠে ধরতে পারে না। বাপীই মামকে আজকালের অনেক আগে থেকেই বলছে এতটুকু ছেলের সামনে যা খুশী কেন বল, বল তো! আবার বলো ব্যবহারে বংশের পরিচয়। মাম অবশ্য এখন বলেন, ব্যবহারে মায়ের পরিচয়। সে মায়ের পরিচয় বহন করবে কারণ মূলত সে মায়ের কাছেই থাকছে। মাঝে মধ্যে বাপীর কাছে আসে। মাম অফিসের ফিল্ড ট্যুরে না গেলে এবারও তার আসা হতো না। নানু নানাও দেশের বাড়িতে গেছে। তাই আসা গেল। বাপীর কাছে আসতে তার ভালো লাগে। তাদের পুরাতন বাসাটা। সব ঘর তার চেনা। সব জিনিস তার। ওখানে সব নানা নানীর জিনিস। মামাদের খালাদের জিনিস। তার নিজের বেশি কিছু নেই। মাম বলেছেন এ বাসা থেকে সব নিয়ে যাবেন। বাপী বলেছেন দেবেন না। মাম বলেছেন কেকা যখন ছুড়ে ছুড়ে সব নিচে ফেলবে আর পুরো এলাকার ফকিররা এসে সব কুিড়য়ে নিয়ে রওনা হবে তখন খবর হবে। আজ একটু আগে এখানে হরিদা কাকু তাকে দেখিয়েছেন  দুপুরের জন্য কি কি খাবার উনি রেঁধে দিয়েছেন। ময়না ফুফু আসেনি বলে তো আর খাবার বাদ যাবে না। মুরগি আর বেগুন ভাজা। মজার খাবার। ফ্রিজ থেকে একটা চকবার আইসক্রিমও বের করে দিয়েছেন। মজা মজা খুবই মজা। কিন্তু ঐ এক মিকা আন্টি, আর সওয়া যাচ্ছে  না । চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রয়েছেন। ঠিক সামনের অ্যাপার্টমেন্টটাতেই ওনারা থাকেন। পাঁচ বোনের বিশাল লম্বা লাইন, ইনি সবার ছোট। এই আন্টিদের সবচেয়ে বড় জনই মিকা আন্টি। উনিই খুব চেষ্টা করেছেন এই বাসাটাতে ঢুকে পরার। মাম তো বলেই ওদের বাসায় জায়গা হচ্ছে না দেখে এ বাসায় ঢোকার ফন্দি করছে।  কি? কি ভাবছিস? আমি তোমাকে নিয়ে কিছু ভাবছি না। তুই কি ভেবেছিস তোর সুতা টোটকায় কাজ হবে? এই যাহ জেনে গেল কিভাবে? সৌম্য দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে ভেতরে গিয়ে এক ছুটে বাপীর বুকের ভেতর ঢুকে পড়বে কিনা ভাবছে। কেকা আন্টি দ্রুত কাছে এসে হাত চেপে ধরলো, বললো,  তো সৌম্য বাবু তোমার ঐ সুতা টোটকার বুদ্ধিটা কে দিল তা আমি জানি। চোখ নাচাচ্ছেন উনি। একটু একটু হাসছেনও। খুব বুঝি ইন্ডিয়ান টিভিতে গ্রহ নক্ষত্রের রাশিচক্রের প্রোগ্রাম দেখা হয়। আমিও দেখেছি সুতা টোটকা। গাট ছড়া বাঁধে সুতায়, মঙ্গলসূত্রের সুতা বাঁধে হাতে, ভাইফোটায় হাতে রাখি বাঁধে ইত্যাদি সব আমিও শুনেছি জ্যোতিষ মহারাজের অনুষ্ঠানে। তাই আমি বুঝতে পারছি যত্রতত্র তুই কেন সুতা বাঁধছিস ঘরে। বলে এবার খুব হাসছে কেকা আন্টি। হাসতে হাসতেই বললো, আরে বোকা ঐ টোটকায় কোন কাজ আমাদের হবে না। আমরা অন্যদেশের মানুষ তাই হবে না। তোর বাবাকে আমারও পছন্দ না। আমাদের আগের দুলাভাই কত ভালো ছিল। আপাটা যে কি, কেন যে তাঁকে ছেড়ে চলে এলো ৩২ বছর বয়সে, আমার এই ২০ বছরের জীবনে আমি তা বুঝলাম না, সেই সঙ্গে তোর বাবাকে কেন পছন্দ করলো তাও না। আগের দুলাভাই পরশু দিনও এসেছিল, বলেছে আপাকে ফিরে যেতে। আপা চলে গেলেই ভালো। তুইও খুশি হবি। তা না আপাটা তাকিয়ে বসে আছে সামনের বাসার দিকে। যা যা আরো সুতলী বাধ এখানে ওখানে। পারলে বাপ মা দুজনকেই এক সুতায় বেঁধে ফেল শক্ত করে। হরিপদকাকু এতক্ষণ শুনছিলেন পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে। এবার বললো, এরকম একটা ছোট্টা বাচ্চা ছেলেকে এভাবে বলা কি ঠিক দিদি। বলতে বলতে তাকে একরকম ঠেলে ঘরে ঢুকিয়ে দিল। দরজাটাও লাগিয়ে দিতে দিতে বললো, যাও বাবা ঘরে গিয়ে বাপের কাছে ঘুমাও বা শুয়ে থাক। ব্রোকেন ফ্যামেলিতে আমি বড় হয়েছিল। তোমার মতনই অনেকের অনেক কথা শুনতে হয়েছে। এক সময় সয়ে যাবে।একটা হু হু করা কষ্ট বুকের ভেতর উঠে আসে সৌম্যর। ব্রোকেন ফ্যামিলি কথাটা তার অপছন্দ। তাদের ফ্যামিলিটা ভেঙে যাচ্ছে এটা সে মানতে পারছে না। সে এত চেষ্টা করছে তারপরও ধরে রাখতে পারছে না। নানীর সাথে বসে টিভিতে দেখছিল একটা রাজ জ্যোতিষীর অনুষ্ঠান। বলেছিল সুতা ভাল টোটকা। টোটকার মানে সে জানে না। তবে বুঝেছিল সুতা দিয়ে ধরে রাখা যায়, এটুকুই বুঝেছে। নানীর এক বাক্স সুতা,  সব এনে এ বাসায় রেখে গিয়েছিল। গতবারই করেছে যখন এসেছিল। বাপীকে কি এবারও সুতা বেঁধে দিলে ভালো হতো! একটা সেলাইয়ের হলুদ বান্ডিল টিভির নীচে রেখেছিল। আছে পরে সেখানে এখনও। পুরা বাসাতে বহু জায়গায় নানীর মেশিনের সুতাগুলোর ছোট ছোট বান্ডিল এনে ছড়িয়ে দিয়েছিল। বাসাটাকে তার বেঁধে রাখা দরকার। গতবার এক রাতে মানে গত সপ্তাহেই হলুদ সুতা দিয়ে বাপীর এক পা বেঁধেছিল। চিকন সুতা। অনেকক্ষণ পেঁচাতে হয়েছিল। পুরোটা  পেঁচিয়ে শেষ করে বেগুনী সুতা দিয়ে আরেক পা বাঁধলো, ওটাতে অনেক সুতা ছিল। বাকিটুকু রেখেছিল আলমীরার চিপায়। নানীও ওদিকে ক’দিন ধরে অনেক খুঁজেছে। আছে ওটা খাটের নিচে। কিন্তু খালি। ফাঁকা। বাপী ঘুম থেকে উঠে তাকে জিজ্ঞেস করলে খেলা করছিল বলবে ঠিক করে রেখেছিল। বলবে না যে ওতে যাদু আছে। জাদু দিয়ে বেঁধে রাখতে চাইছে সে তাদের সবাইকে একসঙ্গে। বাপী উঠে সুতা দেখে তাকে কিছুই না বলে সুতা পরেই ঘুরে বেড়ালো। পরে গোসলের পানিতে ভিজে ভিজে রং বের হয়ে ঐ সুতা ধ্বংস হয়ে গেলো। বাপী দুঃখ করে বলেছে সেকথা তাকে। কিন্তু এত করেও কি আর বাসাটা আটকানো যাচ্ছে ভেঙে যাওয়া থেকে, মনে তো তা হচ্ছেনা। নানী বলেছেন খোদাকে বলতে। গতকালকে বাবার সঙ্গে জুমার নামাজে গিয়েছিল। তখন বলেছিল। অনেক বলেছিল আল্লাহকে। আমাদের বাসাটা ভেঙো না। নামাজ শেষে বাপী জানতে চাইলো, কি কি চাইলি আজ। ছোটবেলায় তো শবেবরাতের রাতে একগাদা খেলনা লিস্ট দিতি আল্লাহ পাকের দরবারে। এটা চাই ওটা চাই। পরের দিন সকালে উঠেই আমি আর তোর মা মিলে সব কিনে আনতাম। আজ কি চাইলি? বাপীকে সে বলেনি সে চেয়েছে একটা বাসা। হরিপদকাকু চলে গেছেন, বাপী ঘুমাচ্ছেন। সে বাপীর পাশে এসে বসলো, কিন্তু ঘুমাতে ইচ্ছে হলো না। উঠে গিয়ে টিভি খুলে বসলো ড্রইং রুমে। কার্টুন চালায়। মাম আজকাল প্রায়ই বলেন সে নাকি সারাক্ষণ কার্টুনে মুখ গুঁজে বসে থাকছে। পড়ায় নাকি মন নেই। মায়ের সঙ্গেও নাকি আগের মতন গল্প করে না। মামই বলে এসব। মাম জানে না যে কার্টুনগুলোর সঙ্গে থাকলে তার ভয়গুলো দূরে থাকে। বুকের ভেতর কিসের যেন ভীষণ একটা ভয়। কেবলই মনে হয় সব বুঝি ভেঙে পড়ে যাচ্ছে খান খান হয়ে তার চারদিকে। সে চাপায় পড়ে ভর্তা হয়ে যাচ্ছে। ভয় থেকে ভুলিয়ে রাখতে টিভি তার খুব ভালো  বন্ধু। বাপী ছিল তার  আরেক ভাল বন্ধু। ক্রমে বুঝতে পারছে বাপী দূরে চলে যাচ্ছে। বাপী যে দূরে চলে যাচ্ছে এটা সে বুঝতে পারছে কিন্তু মানতে পারছে না। যতই চাইছে হাত বাড়িয়ে ধরতে, পারছে না। মিকা আন্টিই এটা করছেন কোনোভাবে। মিকা আন্টি তাকে যতই আদর করুক না কেন এখন আর তার মিকা আন্টিকে ভালো লাগছে না। মিকা আন্টি যেন বাপীকে সরিয়ে ফেলছে। এতদিন এ বাসায় এলেই সে তো বাপীর কাছেই শুতো। এবার বাপী তাকে পাশের রুমটা দেখিয়ে দিল। বলল, এবার থেকে এটা তোমার রুম। কোথায় কি রাখতে চাও, সাজাতে চাও বল, তোমার মনের মতন করে দেব। এ বাসা থেকে যখন গিয়েছে তখন তারা একসঙ্গে ঐ রুমটাতে থাকতো, বললও তাই। এতদিন তো একসঙ্গে এক রুমে থাকতাম। তুমি বড় হচ্ছো। যখন এ বাসা থেকে তোমার মা তোমাকে নিয়ে চলে গিয়েছিল তুমি কতটুকুই বা ছিলে সাড়ে চার বা পাঁচ। এখন তো সাত। ঐ বাসাতেও তোমার আর উচিত না মায়ের সঙ্গে শোয়া। বাপী  তাকে কখন বলে তুমি, কখন তুই, বলেছে আরো বড় হলে আপনি বলবে। আমি তোমাদের দুজনকে দুইপাশে নিয়ে একসঙ্গে শুতে চাই। বড় বেলায় সেটা কি আর সম্ভব। ডবল ভিজিট না হওয়া পর্যন্ত আমি বড় না। আমারও ছোট থাকবার সাধ ছিল বড়। ভাবতাম সাইকেল না চালালে বড় হবো না। সবাই বলতো সাইকেল চালালে দ্রুত লম্বা হয়। তাই সাইকেল বাদ। কিন্তু কোনো লাভ হয়েছে কি? হয়নি। যখন বড় হবার তখন হয়েই গেছি। হুম। শোন তোর নানার বাসায় তো আলাদা করে একটা রুম তুই পাবি না। ওখানে অত রুম তো নেই। তুই আয় না চলে একেবারে এখানে। বাপ ছেলেতে অনেক মজা হবে। মাঝে মাঝে মাকে না হয় গিয়ে দেখে আসবি। মাম একা থাকতে পারবে না। তোর মাম তো শুনলাম মাকিদ বা ফাকিদ কাকে যেন বিয়ে করবে। ভালই হবে আমি তাহলে ওদের দুজনের মাঝে থাকবো। বাপী তার কথায় চুপ করে গিয়ে চুপচাপ তার দিকে চেয়ে থাকলেন। তারপরে বললেন, তুই মিকাকে অপছন্দ করিস অথচ মাকিদকে পছন্দ করিস, কেন রে? সৌম্য জবাব দেয় না। চুপ করে থাকে। বলে না কিছু। মাঝে-মাঝে মনে হয় সে নিজেও জানে না। এখন টিভি দেখতে দেখতে মনে পড়লো আজ সকালে মিকা আন্টি রুমে এসে ঢুকেছিল। অফিসে যাবার আগে আগেই। ঘুমের মধ্যেই মিকা আন্টির গলা শুনে চোখ না খুলেই অন্যদিকে ফিরে শুয়েছিল। আন্টি বেশ কড়া করেই বাপীকে বলেছে, ছেলে বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে থাকলে হবে, আজ না তোমার একটা বিজ্ঞাপনের শুটিংয়ে যেতে হবে গাজীপুর। যাব না। না করে দিয়েছি। সৌম্যের সঙ্গেই দিনটা পার করবো। ওদের কথা দেয়া আছে। শুটিং এর সবকিছু রেডি। বসকে কি বলবো? যা খুশি বল। খামখেয়ালিপনা এই পেশাতে মানাবে না। তুমি একটু ম্যানেজ কর প্লিজ। সৌম্যের আলাদা  শোবার কি করলে? অভ্যস্ত হতে হবে তো। না হলে তো পরে এসে আমাকে এই রুমে দেখলে আমার উপর বিরক্ত হবে। আচ্ছা আজ রাত থেকে চেষ্টা করবো। সৌম্যের জন্য পায়েস করে রেখে গেলাম। দিও ওকে। আচ্ছা ম্যাডাম। জো হুকুম। শোন রেজিস্ট্রি অফিসেও কথা বলে রাখা দরকার, তিনমাস পরের যে কোনো একটা বিয়ের ডেট নিয়ে নিও। আগে সৌম্যর মায়ের সাথে ডিভোর্সটা তো হোক। তিনদিনের মধ্যে সেটা কমপ্লিট করবে। ঠিক তিনদিনের মধ্যে। বলতে বলতেই উনি যেমন এসেছিলেন তেমনি বেরিয়ে গেলেন ঠক ঠক করে। তার মানে আগামী তিন মাসের মধ্যেই সব ঘটবে। হঠাৎ তার মন চাইছিল উঠে গিয়ে ছুট দিয়ে মাকে খবরটা দিতে। এই খবর শুনে মা যদি দৌড়াতে দৌড়াতে এ বাসায় চলে আসে বেশ হয়। তারপর ঠেসে দরজাটা লাগিয়ে দিত। তাহলে আর মিকা আন্টি এ বাসায় আসতে পারতো না। মিকা আন্টি একটা পচা আন্টি। বলবে এরপরেই যখন বাপী জানতে চাইবে কেন অপছন্দ তখনই বলবে, সে এই বাসাটার রানি হয়ে উঠছে। এটা সে মানতে পারছে না। এটা তার মায়ের বাসা। পায়েস খাবি, দিয়ে গেছে তোর মিকা আন্টি। বাহ্‌ বাপী ঘুম থেকে উঠে এসেছে। আজ ওদের বাপ ছেলের অনেক প্রোগ্রাম। শপিং এ যাবে। ফালুদা খাবে। রাস্তায় সে কিছুক্ষণ সাইকেল চালাবে, পার্কে যাবে কত কি। পায়েস আমি পছন্দ করি না। সে কি এতদিন তো করতি। আর করি না। কি হয়েছে তোর? তোর মায়ের নানীর পায়েসও অপছন্দ করিস। না শুধু মিকা আন্টির পায়েস অপছন্দ করি। হুম, কেন? এটা তো ঠিক না। হঠাৎ ভালো একটা কিছুকে খারাপ বলা তো খুবই খারাপ লক্ষণ। আমি নানাইয়ের কাছে যাব। কেন? আমার খুব কান্না পাচ্ছে। নানাইয়ের কাছে কাঁদবো। আমার কাছে কাঁদ। বলতে বলতে বাপী এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলো। উনি তোর মায়ের বাবা। আমি তোর বাবা। মা তার বাবার বাড়িতে থাকছে। আমি তো আমার বাবার বাড়িতে থাকতে পারছি না। থাকছিস তো মেহমানের মতন। মাঝে-মাঝে। যখন তখন সবাই এখানে এসে ঢ়ুকে, ভালো লাগে না আমার। বাপীই চুপচাপ দেখছে তাকে। কিছু বলছে না। নিজের চুল নিজেই ওলটপালট করছে। চুলকাচ্ছে। উকুন ঢুকেছে নাকি? শোন হে বালক, সবার জীবন একরকম হয় না। সবাই ভিন্ন। তুমি যখন বড় হবে বুঝতে শিখবে অনেক বেশি করে সবকিছু, তখন জানবে যে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটাই সবচেয়ে জটিল। কেন এটা গড়ছে বা ভাঙছে আমরা খুব একটা সচেতনভাবে তা বুঝে বুঝে মেপে-মেপে পথ ঠিক করে উঠি না। মন মানসিকতা, যেভাবে আমাদের মনোজগৎ তার পরিবেশ থেকে দেখে-দেখে শিখে উঠে তার উপর ছাপ ফেলে-ফেলে সে ভালো-মন্দের আনন্দের একটা ছবি আঁকে। ওতে যে মিশে যায় তাতেই তার আনন্দ আসে। অমিলেই অশান্তি। এতে কারওই কোনো দোষ নেই। তুই যেমন মিষ্টি খেতে ভালোবাসিস আমি যেমন টক খেতে ভালোবাসি তেমনি এটা। যে মিষ্টি খেতে পছন্দ করবে তোর তার সঙ্গে বসে খেতে ভালো লাগবে। অবাক হবি ভেবে ঐ আরেক লোক খায় কেমনে টক। এরপরের বিচক্ষণতাই হচ্ছে মানব জীবনের এই বহু ধরনের রকমফের মেনে নেয়া। এখানেই আমরা অনেকে হেরে যাই। সব চাই নিজের মতন করে। নিজের হিসাবে। তখন গরমিলগুলো বাড়তে থাকে। বাপী তার দিকে চুপ করে চেয়ে আছেন। তুই কি বুঝতে পারছিস আমি কি বলছি। না। না? হ্যয়, এত কঠিন কথা আমি বুঝি না। বাবাই টেবিলের উপর আঙুল দিয়ে টকটক শব্দ তুলে পিয়ানো বাজালেন যেন। সে একবার ভাবলো বলে বাপী আমি সব বুঝি, আমাকে অত বুঝাতে হবে না। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়, না বলবে না। বললেই বাপী ভাববে সে বড় হয়ে গেছে। বাপী দূরে চলে যেতে পারবে না সে ছোট থাকলে। চল, বেড়াতে চল, বলতে বলতে সে বাপীকে এসে জড়িয়ে ধরলো। হঠাৎ তখুনি কোত্থেকে যে কেকা আন্টি ছুটতে ছুটতে এলো। বাপী কি তাহলে দরজাটা আবার খুলে রেখেছিল। এসেই বললো,  ভাইয়া সর্বনাশ হয়েছে। মিকা আপার এক্সিডেন্ট হয়েছে। সে কি! এখন কি অবস্থায় আছে। কেকা আন্টি বললেন অনেক কিছু। সৌম্যের শুনতে ইচ্ছে হলো না। বুঝলো, বাপীকে এখন যেতে হবে হাসপাতালে। বাপী কাপড় পরছেন। বাপী ছুটেই প্রায় বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন, কেকা আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত ওকে তোমাদের কাছেই রেখো। সৌম্য হঠাৎ বাপীকে জিজ্ঞেস করলো, বাপী আন্টি কি মারা যাবেন। আরে না না কি বলিস, বলতে বলতে মাথায় একটা হাত দিয়ে আদর করে দিয়ে চলে গেলেন। কেকা আন্টি আবার সেই সকালের মতন চোখগুলো গোল করে বললেন, হুম, খুব খুশি হতিস যদি শুনতে পেতিস মিকা আপু মারা যাচ্ছেন, তাই না। তুমি খুব খারাপ। কি বললি? তুমি খুব খারাপ। কেন। আমি অত খারাপ কথা ভাবি না তাই। ও, আপুর জন্য তোর দরদও আছে দেখছি। ও তোমাদের বাসায় থাকলেই তো হয়। আমাদের বাসায় না আসলেই  হয়। আসলে তো তোরই সুবিধা। তোর সব কাজকর্ম করে দেবে। রেঁধে খাওয়াবে। অসুখ হলে সেবা করবে। স্কুলের পড়া পড়িয়ে দেবে। লাগবে না ঔসব। মা-পাবি একটা, অসুবিধা কি? মাম বলেছে নিজের মা ছাড়া কারও মাঝে মায়ের গন্ধ খোঁজা বোকামি। বাপী অবশ্য বলেছে মায়ের বয়সী সবাই মা। মাম জগৎময়। যা কিছু সুন্দর সব-ই মা। যদিও ভেবেছিল কথাটা মায়ের কানে তুলবে না, তারপরও বলে ফেলেছিল। মাম শুনে পুরা ঘরে তিনচার বার পাঁয়চারী করেছে। দৌড়েছে বলা চলে। বলেছে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে এত্ত বড় সাহস। বিশ্বময় সবাই তোর মাম। তাহলে সবাই তোর বাবার বউ হলো কি না বল। কিরকম দৃষ্টিভঙ্গি তোর বাপের। আরো অনেক কঠিন কঠিন কথা বলে বলে চেঁচিয়েছে। তারপরে তার দিকে তাক করে চেয়ে থেকে বলেছে আমাকে ছাড়া আর যদি এই জীবনে কখনো কাউকে মা ডাকিস তারপরে বুঝবি মজা। তোকে সোজা আমার পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলে কবরে চলে যাব। কিন্তু পেটের ভেতর ঢোকাবে কিভাবে। বাপিকে জিজ্ঞেস করেওছিল। বাপি সঙ্গে সঙ্গে বলেছে এ আর এমন কি গপ করে গিলে ফেলবে। হয় কখনো এটা! কিন্তু সে আর মামকে এ নিয়ে জিজ্ঞেস করতে যায়নি। মাম হয়তো আবার তাহলে এ বাড়িতেই আসা তার বন্ধ করে দেবে। কি ভালো হবে না। কেকা আন্টির কথায় ওনার দিকে চেয়ে রইলো, জবাব দিল না। চল, আমাদের বাসায় চল। এই শূন্য ঘরে একা কতক্ষণ থাকবি। যেতে মন চায় না ঐ বাসায়। তবে বুঝতে পারছে যেতে হবে, ইচ্ছে না হলেও যেতে হবে ঐ বাসায়। কেকা আন্টি যেন তার মনের কথা বুঝতে পেরেই বললেন, এক জীবনে অনেকবার বাসা বদলাতে হয় মাটির ঘরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত। কোন বাসাই চিরদিনের না। আমাদের ঐ বাসাতে না গেলে সৌম্যবাবু বুঝবেই বা কিভাবে তাদের বাসাটা ছাড়াও আরো অনেক ভালো ধরনের বাসা আছে ভালোবাসায় পূর্ণ হয়ে।
সৌম্য একটু চেয়ে থেকে বললো, বেশ চল যাই তাহলে। সৌম্য এগুলো। জীবনের তাগিদই জীবনকে শেখায়  জীবনের  পথচলা।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

হল প্রশাসনও ছাত্রলীগের কাছে জিম্মি

শুধু ভাতার ওপর নির্ভরশীল হলে চলবে না: প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশে ৬ মাসে প্রায় ৬০০ নারী ধর্ষিত

‘একটা যৌক্তিক সমাধান চাই’

খালেদা জিয়ার নতুন কোনো রোগ ধরা পড়েনি

রেগে গেলেন পুতিন

বছরে ১ লক্ষ কোটি টাকা পাচার হচ্ছে: মান্না

মানবতাবিরোধী অপরাধে ৪ জনের মৃত্যুদণ্ড

জিয়া চ্যারিটেবল মামলায় আবারো জামিনের মেয়াদ বাড়লো খালেদার

যুক্তরাষ্ট্রে আরেক রাশিয়ান গুপ্তচর মারিয়া

রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২

ট্রাম্প-পুতিন বৈঠক, নিজ দলেই সমালোচনা

সমুদ্রবন্দরগুলোকে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত

বার্সেলোনায় মেট্রোরেল দুর্ঘটনায় বাংলাদেশি তরুণের মৃত্যু

বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে টপলেস কেটি প্রাইসের অন্যজগত

সৌদি আরবে বাংলাদেশি হজযাত্রীর মৃত্যু