বিশেষ রচনা

সন্তানের ‘মানুষ’ হবার গল্প

ঈদ আনন্দ ২০১৮

ড. অনিরুদ্ধ চক্রবর্ত্তী | ২৮ জুন ২০১৮, বৃহস্পতিবার
সাঞ্জুরা তার পাঁচ বছরের মেয়ে মিম্মিকে কিছুতেই খাওয়াতে পারছে না। স্কুলের গাড়ি বার বার হর্ণ দিচ্ছে। সাঞ্জুরা ধৈর্যচ্যুত হয়ে মেয়ের গালে মারল এক থাপ্পড়। ভ্যা করে কেঁদে দিল মিম্মি। হাতের কাছে বাটি-থালা সব লাথি মেরে ফেলে দিল মিম্মি। ঘরময় ভাত ডাল মাছ ছড়িয়ে পড়ল। ব্যাস, হয়ে গেল মিম্মির খাওয়া আর স্কুলে যাওয়া। উপর থেকে সাঞ্জুরা বলে দিল আজ আর মিম্মি স্কুলে যাবে না।
সাঞ্জুরা আর গোলাম’-এর একমাত্র সন্তান মিম্মি।
বিয়ের পর একসাথে থাকাটা দুঃসহ হয়ে ওঠার জন্য গোলাম, বাবা-মায়ের সংসার ছেড়ে ঊত্তরায় আলাদা ফ্ল্যাট কিনে সাঞ্জুরাকে নিয়ে চলে আসে। মিম্মি তখন মাত্র এক বছরের। আলাদা হবার পর থেকে মিম্মির দাদা-দাদী খুব একটা আসেনি এই বাড়িতে। দাদা-দাদীকে খুব ভালোবাসে মিম্মি। কিন্তু হলে কি হবে, দাদা-দাদী যে দুজনেই খুব অসুস্থ! কারো সাহায্য ছাড়া ওরা বাইরে আসতেই পারে না। তা ছাড়া ওরা থাকে সিদ্ধেশ্বরীতে, অনেক দূরে। অফিসের কাজে গোলামকে প্রায়ই চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, যশোর দৌড়াতে হয়। ফলে বাবা-মাকে নিয়ে আসা বা তাদের সাথে দেখা করার অবকাশ দুটোর কোনটাই ওর থাকে না। সাঞ্জুরার পক্ষে অত দূরে গিয়ে শ্বশুর-শাশুড়িকে নিয়ে আসা সম্ভব নয়। তাই মিম্মির কপালে আর দাদা-দাদীর আদর খাওয়া অধরাই থেকে যায়। এখন মিম্মি বুঝতে পারে, তার ভালোলাগার জন্য বাবা-মা তাকে কেবল ভাল খাবার এনে দেয়, জামাকাপড় কিনে নিয়ে আসে দরকার না থাকলেও। সারা বিকালটা ওর চার দেয়ালের মাঝে কেটে যায়। কখনো কখনো নীচে যায় বটে কিন্তু তার সঙ্গী থাকে কাজের মেয়ে অবলা।
সাঞ্জুরার মা নেই। বাবা থাকেন বিক্রমপুরের গ্রামের বাড়িতে। গ্রামে তার কাঠের ব্যবসা। একমাত্র ছেলে সাবুই এখন ঢাকা শহরে কাপড়ের ব্যবসা করে। সাবু তার দিদির বাড়িতে আসে মাঝে মাঝে। তবে আসাটা কেবলমাত্র টাকার জন্য এ কথাটা সাঞ্জুরা যেমন জানে তেমন গোলামও জানে। তবে ছোটভাই বলে কিছু বলে না। ছোটভাইয়ের পড়াশোনা খুব একটা হয়নি বলেই বাবা ব্যবসার কাজে লাগিয়ে দিয়েছে।
এইরকম একটা পরিবেশে মিম্মির বড় হয়ে ওঠা। ছোট্টবেলা থেকে শিশুমনের উপযোগী পরিবেশ বা উপকরণ সে পায়নি। রুপকথার গল্পের রাজপুত্র রাজকন্যারা কখনই তার জীবনের অঙ্গণে এসে খেলা করেনি। সে পাখি দেখে উল্লাসে হাততালি দেবার সুযোগ পায়নি কোনদিন। প্রকৃতির অনন্য রূপ দেখে আহ্লাদে আটখানা হবার সুযোগ তার জীবনে আসেনি।
কেন আসেনি! কোন প্রতিবন্ধকতা তার ছোট্ট গড়ে ওঠা জীবনে দৈত্যের মতন পথ আগলে এসে দাঁড়িয়েছে, সেই কথা বলার জন্যি আজকের এই অবতারনা।

২.
সাঞ্জুরা এবং গোলাম যখন বাবা-মা হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করল, তখন তারা কখনই শিশুদের মানুষ করবার শিক্ষায় নিজেদের রপ্ত করে তোলার কথা ভাবেনি। শিশুর পোষাক, খাবার, শারীরিক সুস্থতার জন্য দাদা-দাদী ও চিকিৎসকের সহায়তা ছিল একমাত্র নির্ভরতা। বাবামায়ের সঙ্গ ত্যাগ করে আসার সময় বাহ্যিক সাচ্ছ্যন্দ ও সুখের কথাই ভাবা হয়েছিল। শিশুমনের আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণ নিয়ে একটুও ভাবা হয়নি। ভাবা হয়নি তার দৈনন্দিন জীবনে সাথী সঙ্গিদের কথা। চলার পথে প্রতিটি বিষয় যা মিম্মিকে কাছে টেনেছে সেগুলির গুরুত্বের কথা জানা হয়নি ফলে সে সম্পর্কে ভাবাও হয়নি।
এই পরিস্থিতির জন্য শুধু গোলাম সাঞ্জুরাই কি এর জন্য দায়ী ? আজ ওদের জন্যই কি মিম্মির এই পরিণতি ! একদমই নয়। এর মূল লুকিয়ে আছে গোলাম ও সাঞ্জুরার বড় হওয়ার সময়ে প্রয়োজনীয় সামাজিক ধ্যান-ধারণার সঙ্গে পরিচিত হওয়া। অর্থাৎ মানুষের জীবনে কোন কোন বিষয়গুলি তার বড় হয়ে ওঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সেইগুলি। যেমন ধরা যাক, ছোট বয়সে কেমন করে আচার-আচরণে সামাজিক হয়ে ওঠা যায় সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া। কেমন করে সে খাবে, কোন জামাকাপড় পড়বে, অতিথি এলে তার সাথে কেমন ব্যবহার করবে, বড়দের-ছোটদের প্রতি কতটা সহানুভূতিশীল হবে, ইত্যাদি বিষয়গুলি। ওদের পারিবারিক বৃত্তের মধ্যে গোলাম বা সাঞ্জুরার বড় হয়ে ওঠার পিছনে এইসব বিষয়গুলির হদিস দেবার জন্য তেমন কেউই ছিল না ফলে গোলাম এবং সাঞ্জুরার বাবা-মায়েরা তাদের মা-ঠাকুমার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গোলাম এবং সাঞ্জুরার মানুষ করার ব্যবস্থা কায়েম করেছে। ঠিক এভাবেই শিশুশিক্ষায় ওয়াকিবহাল না হয়ে সাঞ্জুরা ও গোলামের বিয়ে হয়ে যায় হৈ হৈ করে। সবাই কবজি ডুবিয়ে খানা-পিনা করে ঘরে ফিরে যায়। কিন্তু এদের বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করবার আগে সন্তানের মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার জন্য এ পর্বে কেউই সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়নি। এমনকি বিবাহিত জীবনে এই বিষয়গুলি সম্পর্কে সম্ভবত কেউই ওয়াকিবহাল করানোর ব্যবস্থা করে উঠতে পারেননি। আসলে আমাদের সমাজে যে এর চল নেই। তাই কি করে এদের জীবনে তার হদিস পাওয়া যাবে? ফলশ্রুতি হিসেবে মিম্মির মানুষ হয়ে ওঠা অনিশ্চিত হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে।
মিম্মির সমস্যাগুলি ভালো করে বোঝার চেষ্টা করা যাক। এই কাজটা খুব সহজ নয়। আবার অসম্ভবও নয়। ধৈর্য ধরে মিম্মির প্রতিদিনের জীবনকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা। অর্থাৎ তার আনন্দ-দুঃখ, রাগ, ভালোলাগা-মন্দ লাগা, অভিমান-কষ্ট ইত্যাদি বিষয়গুলি বোঝার চেষ্টা করা।
মিম্মির জ্ঞান হওয়া থেকে এ পর্যন্ত বন্ধুর মত কাদের ও পেয়েছে? ও-বাড়ি ছেড়ে আসবার আগে পর্যন্ত দাদা ও দাদি ছিল ওর আংশিক সঙ্গী। কিন্তু তারাও ওয়াকিবহাল ছিলেন না শিশু-শিক্ষার বিজ্ঞান-ভিত্তিক দিকগুলো। বেশিরভাগ সময়তো মিম্মিকে কাটাতে হত মায়ের সাথে। কখনও কখনও বাবা বাড়ি থাকলে তার সঙ্গে। যেহেতু বাবা বেশীরভাগ সময়ই বাড়িতে থাকে না সেই জন্য তিনিও মিম্মিকে সঙ্গ দেবার ব্যাপারে সঠিক ভূমিকা পালন করতে পারেননি।
মিম্মির বাবা-মায়ের সাথে আমার দেখা হয়েছিল গত ফেব্রুয়ারি মাসে। ঠিক সেদিন, যেদিন মিম্মির স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে সাঞ্জুরা মিম্মিকে ওদের শোবার ঘরে বন্ধ করে রেখেছিলেন। ওদের বাড়িতে গিয়েছিলাম সাঞ্জুরার মামাত ভাই আলমগীর’এর সাথে। ঘরে ঢোকার পর সাঞ্জুরা একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। এইসময় মিম্মি বন্ধ ঘরের দরজায় ধুম ধুম করে ধাক্কা দিচ্ছিল। সাঞ্জুরার মুখে



তখনও মেয়ের ওপর রাগ জমে আছে। আমি কিছুটা আঁচ করে বলেই ফেললাম, ‘কিছু যদি মনে না করেন তো আপনার মেয়েকে নিয়ে আসুন না।’
‘আপনি জানেন না ভাই, ও কত বড় শয়তান ! আজকে স্কুলে পাঠতে পারলাম না ওর বদমায়েশির জন্য”।
আমি আস্বস্থ করলাম যে, আমি ওকে যোগ্য শাস্তিই দেব। সাঞ্জুরার ভাই বলাতে দরজা খুলে নিয়ে এল মিম্মিকে। মিম্মির চোখে তখনো কান্নার জল জমে আছে। মুখখানা থমথমে। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক জায়গায়। আমি উঠে গিয়ে মিম্মিকে নিয়ে এলাম এক্কেবারে আমার কোলের কাছে। দেখি, চোখ ফুলে গেছে কাঁদতে কাঁদতে। ওদের কাছে অনুমতি চাইলাম মিম্মিকে ছাদে নিয়ে যাবার জন্য। অনুমতি পাওয়া গেল। যাবার আগে চোখ মুখ ধুইয়ে দিলাম জল দিয়ে। মাথার চুলগুলো চিরুণী দিয়ে আঁচড়ে নিয়ে হাত ধরে যখন বললাম, “মামন, তোদের ছাদে নিয়ে যাবি?” মুখে হাসি ফুটল মিম্মির। ছাদে যাবার রাস্তা ঐ আমাকে দেখিয়ে নিয়ে গেল। মুক্ত আকাশ, মুক্ত বাতাস। চার দেয়ালের যন্ত্রণাময় পরিমন্ডল আর মিম্মিকে ভয়ে দেখাচ্ছে না। মাথায় হাত বুলিয়ে গাছপালা, জীবজন্তু, বাবা-মা সবার কথা বলাতে ও একটু সহজ হয়ে আমাকে সব মনের কথা খুলে বলল। সাঞ্জুরা কেন ওকে এত মারধর করে, কেন ওকে খেলতে দেয় না, কেন ওকে বেড়াতে নিয়ে যায় না। কেন ওর স্কুলে যেতে ভালো লাগে না, জোর করে কেন ওকে বাবা-মায়ের পছন্দের খবার খেতে হয় - এরকম হাজার একটা ‘কেন’ !
বুঝতে পারলাম বাবা-মায়ের সাথে মিম্মির একটা বড় দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে। মিম্মির পৃথিবী সম্পর্কে সাঞ্জুরা বা গোলাম কেউই ওয়াকিবহাল নয় মনে হল। যতক্ষণ না ওরা এই বিষয়টা বুঝতে পারবে ততক্ষণ মিম্মির ভবিষ্যৎ আকাশ তো মেঘমুক্ত হতে পারবে না। মানুষ তো প্রকৃতিজাত। প্রকৃতির মাঝে সকলের সাথে সাযুজ্য রেখে সে বড় হয়ে ওঠে। সকল স্তরের মানুষের সাথে তার নিত্য যোগাযোগ বজায় রেখে তাকে সমাজ সচেতন করে তুলতে হবে। ফুলের মতন শিশুদের শক্ত কথা বলা, শক্তভাবে শাস্তি দেওয়া, শক্ত আবরণে আবদ্ধ করে রাখা মানেই শিশু মনকে হত্যা করা।
মিম্মির প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ওকে একটা হনুমান কি করে একটা কুমীরকে বোকা বানিয়েছিল, সেই গল্পটা শোনালাম। তারপর আর একটা। মিম্মির চোখে তখন স্বপ্নপুরের অচিন পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে। ওর মুখে তখন এক চরম প্রশান্তি ছড়িয়ে যাচ্ছে। সূর্যের আলো ক্রমশঃ প্রখর হয়ে উঠছে। এবার নীচে যেতে হবে। ছাদ থেকে নীচে ন্মবার উপক্রম করতেই আমার হাত ধরে আটকে দিল।

-“ তুমি আজ যাবে না। আমার সাথে থাকবে”।

বুঝলাম, মিম্মির নেশা ধরাতে পেরেছি। কিন্তু এ নেশা তখনই কেটে যাবে যখন এরকম কোন পরিবেশের সংস্পর্শ আর পাবে না। আর এই পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য বয়স-জাত-ধর্ম-শ্রেণি কোনটাই লাগে না। যেটা লাগে সেটা হল, শিশুমন বুঝতে পারার ক্ষমতা। এটা একদিনে গড়ে ওঠে না। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টাতে গড়ে ওঠে। আমার বন্ধু সাঞ্জুরার মামাত ভাইকে চুপি চুপি বললাম, মিম্মির কঠিন অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ কি হতে পারে। কিন্তু ও খুব হতাশ হয়ে জানালো, সাঞ্জুরাকে দিয়ে এসব হবে না। শুধু শুধু সময় নষ্ট। আমি ছাড়বার পাত্র নই। বুঝলাম আজ আর এসব নিয়ে কথা বলার দরকার নেই। আর একদিন তৈরি হয়ে আসতে হবে।
মিম্মিকে কথা দিলাম, সামনের শুক্রবার স্কুল ছুটি থাকবে, ঐদিন আমি আসব। সাঞ্জুরাকে বললাম, কিগো, দুটো খেতে দেবে তো ! সাঞ্জুরা একগাল হেসে বলে, দাদা, কি যে বলেন ! আমারই তো বলা উচিত ছিল। বলেন আপনি কি খেতে ভালোবাসেন ! না বললেই কতরকমের রান্না করে রাখে, আর বললে তো কথাই নেই। বাংলাদেশের আন্তরিকতার তুলনা সারা পৃথিবীতে পাওয়া মুশকিল। তাই কিছু না বলেই সেদিন চলে এসেছিলাম।

৪.
শুক্রবার, সাঞ্জুরারা দাদা আলমগীর জানালো ওর একটা জরুরি কাজ পড়ে যাওয়ায় আমার সঙ্গে যেতে পারছে না। আমি যেন মনে কিছু না করি। ভাবলুম, আজকের কাজটা অধরাই থেকে যাবে। কিন্তু একটু পর সাঞ্জুরা ফোন করে জানালো, দাদা, ভাইয়া আসতে না পারলেও আপনি আসবেন কিন্তু। মিম্মি সকাল থেকে ভালো মামু আসবে বলে বার বার আমাকে বিরক্ত করছে। শুনতে শুনতে মিম্মির হাসিভরা মুখটা ভেসে উঠছে। এবার আর না গিয়ে থাকতে পারলাম না।
কলিংবেল’-এর আওয়াজ শুনে দরজা খুলে দাড়ালো স্বয়ং মিম্মি। পিছনে সাঞ্জুরা। মিম্মি আমার আঙুল ধরে নিয়ে যাচ্ছে আর সাঞ্জুরা প্রায় মারতে যাচ্ছে আমাকে ‘বিরক্ত’ করছে বলে। সাঞ্জুরাকে নিশ্চিত করে দিলাম, মিম্মি মোটেই আমাকে বিরক্ত করছে না। বরঞ্চ ওর সাথে কথা বলার জন্য যে বন্ধুত দরকার ছিল, সেটা যে পাওয়া যাবে তার নিশ্চয়তা পাওয়া গেল।
মিম্মি আমার কথা মতো ছবি এঁকেছে, রঙিন কাগজ কেটে কেটে বাড়ি বানিয়েছে। ওর পুতুলের জন্য বিছানা তৈরি করেছে। সব থেক বড় ব্যাপার, আমি আসবো বলে নিজের হাতে সরবত বানিয়েছে (যদিও নুন একটু বেশিই হয়েছিল)।
সাঞ্জুরাকে আজ শুধু নির্বাক শ্রোতা-দর্শক হয়ে থাকতে বললাম। মিম্মির পড়ার ঘরে গিয়ে ওর জন্য একটা ছবি এঁকে দিলাম। তারপর শুরু হল ভুল ধরার গল্প। ছাদে গিয়ে আকশের বুকে পাখিদের ওড়াউড়ি, দিগন্তে জুড়ে কংক্রিটের জঙ্গল দেখালাম। একটা ঘুড়ি ভো কাট্টা হয়ে গুঁতো খেয়ে নীচে পড়ছে দেখে মিম্মির কি হাততালি। সাঞ্জুরাকে আড়াল থেকে সব দেখতে বলেছিলাম। ও দেখছে আর অবাক হয়ে যাচ্ছে। মিম্মিকে এবার আকশ থেকে মেঘের দেশে কি করে যাওয়া যায় তার গল্প বললাম। মিম্মি এক নিঃশ্বাসে সব গিলতে লাগল। গল্প শেষ হলে নীচে এলাম। আবার খেতে হবে। টেবিল জুড়ে খাবার। ছয় রকমের মাছ, দু রকমের মাংশ, ডিম, তরকারি তিন রকমের। ভাজা তিন রকমের, চাটনী, পাপড়, দই, পাঁচ রকমের মিষ্টি। মিম্মি হুকুম জারী করল, সব খেতে হবে”।
সব কি আর খাওয়া যায় ! আমার সাথে মিম্মিও খেল। সাঞ্জুরা বলল, এত বড় বয়স পর্যন্ত এই প্রথম ও মিম্মিকে এত কিছু খেতে দেখল। অবশ্য এই বেশি খাওয়ার পিছনে আমার যে কোন কৌশল ছিল না তা বলতে পারবো না। খাওয়া দাওয়া শেষে মিম্মি আমার হত ধরে নিয়ে গেল ওর শোবার ঘরে। এখানে নাকি ও একা একা ঘুমায়। বাবা-মা আলাদা ঘরে গুমায়। তাই ওর খুব কষ্ট হয়।


সাঞ্জুরাকে ডেকে ব্যাপারটা শুধরে নিতে বললাম। যে যাই বলুক না কেন, তোমরা তিনজনেই এক ঘরে বা মা-মেয়ে একসাথে শোবে। ওকে আর একটু বড় হতে দাও। দেখবে ও নিজেই আলাদা ঘরে শুতে চাইবে।
সারাটা দিন ওদের সাথে থেকে বুঝতে চাইলাম মিম্মির সমস্যাগুলি কি কি এবং সাঞ্জুরাকে কি ভাবে যুক্ত করা যাবে! যখন বুঝলাম সাঞ্জুরাকে বিষয়ের গুরুত্ব বুঝিয়ে দিলে ও ঠিক ধরতে পারবে।
পরের দিন আমার কলকাতা ফিরে আসবার কথা। মিম্মি আর সাঞ্জুরার জন্য মনটা খুঁত খুঁত করতে লাগল। একবার চেষ্টা করে দেখি না। এইরকম একটা ভাবনা চিন্তা নিয়ে টিকিট ক্যন্সেল করে নতুন টিকিট কেটে ফেললাম। আলমগীরকে সব খুলে বললাম। আলমগীর তো চমকে গেল। দাদা, করেছেন কি? আমার বোন, আমি যা পারিনি আপনি তা করলেন কি করে!
আলমগীরকে জানালাম, তোমার বোন বলেই তুমি ওর সামাজিকীকরণ (socialization) প্রক্রিয়ার বিষয়গুলি জানতে পারোনা যদিনা তোমার এই বিষয়ে পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ না থাকে।
প্রথমেই দরকার শিশুশিক্ষার জন্য একটু পড়াশুনা। রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর, ম্যাডাম মন্তেশ্বরী, অমর্ত্য সেন প্রভৃতি শিশুশিক্ষার কাণ্ডারীদের লেখা এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারে। তারপর সামাজিকীকরণ (socialization) প্রক্রিয়া সম্পর্কে সমাজতত্ত্বের জ্ঞান অর্জন করা।
বাবা-মায়ের সন্তান জন্ম দেবার আগে জেনে নিতে হয় তার সন্তানের শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষার বিষয়গুলি। সমাজে সহনশীল বন্ধু হয়ে ওঠার জন্য কি কি করণীয় সেটাও জেনে নেওয়া দরকার। সন্তানের কাছে বন্ধুর মতন নিজেকে তৈরি করে তোলাটা সব থেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ। চার দেয়ালের মাঝে শিশুকে সীমাবদ্ধ করে রাখার অর্থ তার মানসিক বিকাশের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া। অনেকেই বলেন, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খেলতে যাওয়া, খুনশুটি করা, গল্প পড়ে শোনানোর সময় পাই না। শিশুকে মানুষ করে তোলার সময় যদি না থাকে তবে তার পরিণতির কথাওতো জেনে নিতে হবে !
পরের দিন আলমগীর এল আমার সঙ্গে। মিম্মির স্কুল ছিল বলে আমরা স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার দুঘন্টা আগে পৌঁছে গেলাম ওদের বাড়িতে। সাঞ্জুরার মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। আমাদের বসিয়ে চা নিয়ে এসে বসতেই আমি জানালাম, সাঞ্জুরা দুটো রাস্তা খোলা আছে, এক মিম্মিকে মন প্রাণ দিয়ে মানুষ করা, দুই) যেমন আছে তেমন ভাবেই মানুষ হতে না দেয়া। সাঞ্জুরা আমার কথায় গভীর ভাবে জনালো, দাদা আপনি যেমন বলবেন মিম্মির জন্য আমি তাই করব। এই দুই দিনে দেখেছি আপনি মিম্মিকে অদ্ভুতভাবে পালটে দিয়েছেন। আমি কদিন রাতে ঘুমাতে পারিনি ভেবে-ভেবে। আমি ওর মা অথচ আমি পারবোনা আপনার মতন ওকে কাছে টেনে নিতে! আপনি বলেন দাদা, কিভাবে আমি এটা করতে পারি। শিশুশিক্ষার বই পড়া, শিশু মনোবিদদের সাথে কথা বলা, ছোটদের গল্প পড়ে মিম্মিকে বলা, ওর পছন্দের খাবার তৈরি করে দেওয়া, বেড়াতে নিয়ে গিয়ে মনের আনন্দের শরিক হওয়া। ধৈর্য ধরার চেষ্টা করা, গায়ে হাত না দিয়ে হাসি খুশি আর দুষ্টুমি দিয়ে ওকে বশে আনানো। শুধু

পুঁথিগত জ্ঞান দিয়ে তো এসব করা যাবে না, মাঝে মাঝে আমাদের জানাবে কি কি সমস্যা এখনো মেটাতে পারোনি। একবারে অবশ্য হবে না, ধীরে ধীরে সব আয়ত্ত করতে হবে। তবে তুমি যে বিষয়টা বুঝতে পেরেছো, এটাই তোমার জয়ের জায়গা।
সেদিন খুব আনন্দ হল। মিম্মির মতন একটা শিশুকে আনন্দঘন এক জীবনের মধ্যে স্থাপন করার ব্যবস্থা করতে পারার আনন্দ। সাঞ্জুরার মতন মাকে তার দায়িত্ব পালনে আগ্রহী করে তোলার আনন্দ। ফিরে এসেছিলাম এক নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে। সম্পূর্ণ অপিরিচিত একটি পরিবারের শিশুকে তার পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার অভিজ্ঞতা নিয়ে। যেখানে দেশ, ধর্ম কোন বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো না।

পরে শুনেছি, গোলাম ফিরে এলে সাঞ্জুরা তাকে আমার কাছ থেকে শেখা শিশু শিক্ষার অ আ ক খ সব বলেছে। গোলাম আমাকে টেলিফোন করেছিল। মিম্মির আমূল পরিবর্তনের জন্য আমার কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে। এও জনিয়েছে, সাঞ্জুরার মতন সেও মিম্মির বাবা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার শিক্ষা নিচ্ছে।

লেখক : প্রাক্তন নৃতাত্ত্বিক, ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইন্সটিটিউট, কলকাতা



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

আপনার মতামত দিন

এক নারী দেহরক্ষীর গোপন জীবন

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যে তথ্যগুলো জানা দরকার

রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে রাখার মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে এগোচ্ছে সরকার: ফখরুল

ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ তিতাসের ৮ কর্মকর্তাকে দুদকে তলব

‘বাংলাদেশে এখনও জঙ্গি হামলার ঝুঁকি রয়েছে’

সাকিবের চতুর্থ উইকেট

দুই পার্সেলে ২০৮ কেজি ’খাট’

দুটি আন্তর্জাতিক অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

সাবেক তিন খেলোয়াড়কে ফ্ল্যাট দিলেন প্রধানমন্ত্রী

জনগণের বিরুদ্ধে নয়, কল্যাণে আইন করতে হবে

পুলিশের লাঠিচার্জে জোনায়েদ সাকি সহ আহত অর্ধশত (ভিডিওসহ)

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে স্বাক্ষর না করতে প্রেসিডেন্টের প্রতি অনুরোধ

খালেদার অনুপস্থিতিতেই চলবে বিচার কাজ

গণমাধ্যমের হাত-পা বেঁধে ফেলতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন : রিজভী

চাপ, হুমকির মুখে দেশ ত্যাগ করেছি (ভিডিওসহ)

বন্দরে বৃদ্ধের লাশ উদ্ধার