অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে উত্তপ্ত গাজীপুর

প্রথম পাতা

ইকবাল আহমদ সরকার, গাজীপুর থেকে | ২১ জুন ২০১৮, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৩৪
গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট গ্রহণের সময় কম থাকায় সকাল থেকেই ভোটের মাঠে নেমে প্রচারণা চালিয়েছেন প্রার্থীরা। গত দুই দিনের তুলনায় সকাল থেকেই উৎসবমুখর হয়ে উঠে নগরের অলিগলি। প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকদের গণসংযোগে পুরোদমেই এখন জমে উঠেছে প্রচারণার মাঠ। গণসংযোগ ও পথসভার মাধ্যমে প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে গিয়ে ভোট প্রার্থনা  করছেন, তুলে ধরছেন উন্নয়ন ও সমস্যা সমাধানের নানা প্রতিশ্রুতি। ভোট প্রার্থনার পাশাপাশি প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের মেয়র প্রার্থীদের অভিযোগ পরস্পরের বিরুদ্ধে আরো জোরালো হচ্ছে। আওয়ামী লীগ প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম বিএনপির প্রার্থীকে সরকারি জমি দখলকারী ও আহসান উল্লা মাস্টারের খুনির পরিবারের সদস্য উল্লেখ করে তিনি যেন লুটপাটের জন্য সিটিতে না আসতে পারেন সেজন্য ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে তিনি বিএনপি প্রার্থীদের স্থানীয় প্রশাসনের ওপর আস্থা রাখার পরামর্শ দেন। বিএনপির মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার তাদের দলীয় নেতাকর্মীদের নানাভাবে হয়রানি ও তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলে নির্বাচন ও ফলাফল নিয়ে কোনো ষড়যন্ত্রের চেষ্টা করা হলে সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে খেসারত দিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি করেন।
এদিকে নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি দেখতে গাজীপুরে এসেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা ও নির্বাচন কমিশনারগণ। তারা নির্বাচনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নির্বাচন সমন্বয় কমিটির বিশেষ সভা ও নির্বাচনের প্রার্থীদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেছেন। এই সিটি নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে না। নির্বাচনে সিটির ৬টি ভোটকেন্দ্রে থাকবে ইভিএম।

আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম সকালে সিটি করপোরেশনের ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের গাজীপুরা এলাকায় দিনের গণসংযোগ শুরু করেন। সেখানে সংক্ষিপ্ত পথসভায় তিনি বিএনপিসহ সকল দলের সমর্থন ও ভোট প্রত্যাশা করেন। এ সময় তিনি ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সরকারি জমি দখলকারী ও আহসান উল্লাহ মাস্টারের খুনি পরিবারের সদস্য যেন এই সিটিতে নির্বাচিত হতে না পারেন। একই সঙ্গে সেনা মোতায়েনে বিএনপির দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে, তিনি বিএনপি প্রার্থীকে স্থানীয় প্রশাসনের ওপর আস্থা রাখার পরামর্শ দেন। এ ছাড়া বহিরাগত ও মামলার আসামি সন্ত্রাসীদের এনে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছে বিএনপি এমন অভিযোগ আবারো তুলেছেন তিনি। পরে এরশাদনগরসহ বেশকিছু এলাকায় গিয়ে পথসভায় যোগ দেন জাহাঙ্গীর আলম। নির্বাচনকে ঘিরে অতীতের মতোই নৈরাজ্য সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তল্লাশি চালিয়ে বহিরাগতদের খুঁজে বের করতেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে আহ্বান জানান তিনি। আওয়ামী লীগ প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বলবো প্রত্যেকটি জায়গায় তল্লাশি করা হোক। কোনোভাবে যেন খুনি পরিবারের সদস্য ও অন্যরা এখানে রক্তাক্ত করতে না পারে।

অপরদিকে বিএনপি প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার সকালে নগরের বাঙ্গালগাছ এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। পরে তিনি কানাইয়া, নীলের পাড়াসহ আশপাশের এলাকায় গণসংযোগ ও পথসভা করেন। বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় গিয়ে একাধিক পথসভায় যোগ দেন বিএনপি প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার। ভোটারদের কাছে নগরীর উন্নয়নে নানা পরিকল্পনা তুলে ধরে নিজের পক্ষে ভোট চান তিনি।

এ সময় তিনি বলেন, নির্বাচনে ধানের শীষের বিকল্প নাই। নির্বাচনে কোনো ধরনের অনিয়ম ও কারচুপির চেষ্টা করা হলে সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে এর খেসারত দিতে হবে। দলীয় নেতাকর্মীদের নানাভাবে হয়রানি ও তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচারণা চালানো হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ তুলছেন। বহিরাগতদের বিষয়ে জাহাঙ্গীরের অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, যারা আসছেন তারা জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। দলের নির্বাচনের স্বার্থে তাদের আসার কোনো বাধা নেই। এসব বলে ভোটারদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। তার সঙ্গে দিনভর ছিলেন, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী ছাইয়েদুল আলম বাবুল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ডা. মাজহারুল আলম, জেলা নেতা মীর হালিমুজ্জামান ননী, আফজাল হোসেন কায়সার, আহাম্মদ আলী রুশদী প্রমুখ।

এই সিটি নির্বাচনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সকালে গাজীপুর জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের যৌথ আয়োজনে নির্বাচন সমন্বয় কমিটির বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা। যাতে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার কে এম আলী আজমের সভাপতিত্বে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী ও হেলালুদ্দিন আহমেদ বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সভায় গাজীপুর সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা রকিব উদ্দিন মণ্ডল, জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, গাজীপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা তারিফুজ্জামান ছাড়াও পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, আনসার বাহিনীর প্রতিনিধিগণ এবং নির্বাচন কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
 সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা বলেছেন, গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে এর জন্য যারা দায়ী হবেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ সময় তিনি বলেন সিটি নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করা হবে না। এই নির্বাচনে সিটির ৬টি ভোটকেন্দ্রে থাকবে ইভিএম। নির্বাচনের বর্তমান পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন তফসিল ঘোষণার পর ৮৪ দিন অতিক্রম হলেও এখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে, তাই সুষ্ঠু ভোট হবে।

বিকেলে নির্বাচনের মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের সঙ্গে তারা বৈঠক করেন বঙ্গতাজ অডিটরিয়ামে। সেখানে মেয়র, সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরগণ উপস্থিত ছিলেন।

নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা, ডাকসুর সাবেক ভিপি আকতারুজ্জামান নগরের পূবাইলের তালটিয়াসহ আশপাশের ৭টি ভোট কেন্দ্রকে টার্গেট করে দিনভর নির্বাচনী প্রচারণা চালান ও পথসভায় বক্তব্য রাখেন। আওয়ামী লীগ সমর্থক গাজীপুর জেলা পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ স্থানীয় উন্নয়নে জনপ্রতিনিধি ও পেশাজীবীদের ভূমিকা শীর্ষক এক মতবিনিময় ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার দুপুরে গাজীপুর পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল মালেক সরকারের সভাপতিত্বে ও সদস্য আতাউর রহমানের সঞ্চালনায় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব অধ্যাপক ডা.কামরুল হাসান খান। বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট হারিছ উদ্দিন আহমেদ, গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আমানত হোসেন খান, মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট ওয়াজ উদ্দিন মিয়া, কেন্দ্রীয় পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের সমাজকল্যাণ সম্পাদক মিজানুর রহমান, রোভারপল্লী কলেজের অধ্যক্ষ শরিফুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-রেজিস্ট্রার কৃষিবিদ মজনু মিয়া প্রমুখ। বক্তারা বলেন, উন্নয়নের স্বার্থে নৌকার বিজয়ের লক্ষ্যে সবাইকে সকল ভেদাভেদ ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। যে যেখানে আছে সেখান থেকে নৌকাকে বিজয়ী করার জন্য প্রতি ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটারদের কাছে ভোট চাওয়ার আহ্বান জানান।

ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে নির্বাচনী গণসংযোগ করতে বিএনপি সমর্থক জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও জনপ্রিয় শিল্পীরাও মাঠে ছিলেন। জেলা জাসাস নেতা আশরাফ হোসেন টুলু জানান, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, বেবি নাজনীনসহ তাদের একটি প্রতিনিধি দল পূবাইল ও জয়দেবপুরের বিভিন্ন এলাকায় দিনভর নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন। এ ছাড়াও নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে  কেন্দ্রীয় নেতা আমান উল্লাহ আমান, শ্যামা ওবায়েদসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ নগরবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাদের দলীয় প্রার্থীর পক্ষে ভোট চেয়েছেন। অবশ্য আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা অসীম কুমার উকিলসহ আরো কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা রয়েছেন তাদের দলীয় প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে। এই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোট গ্রহণ ২৬ জুন। এতে ৭ জন মেয়র, ২৫৫ জন সাধারণ কাউন্সিলর ও ৮৪ জন সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

খালেদার গুলশান কার্যালয়ের ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্নের অভিযোগ

মাদার অব হিউম্যানিটি পদক প্রদানের সিদ্ধান্ত

খালেদার সাজা স্থগিতের আবেদন

তারেকের ব্যাপারে ইসির কিছু করার নেই

আওয়ামী লীগের প্রার্থিতা এখনো চূড়ান্ত হয়নি

ভালো প্রার্থীদের জামিন না দিয়ে শুনানি বিলম্ব করা হচ্ছে

ছাত্রদল নেতার পরিবারের আর্তি

বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল

বিবিসি’র প্রেরণাদায়ী নারীর তালিকায় সেই মা

সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সব সমন্বিত পরিকল্পনা নিন

দ্বিতীয় দিনের মতো বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার, নেতাকর্মীদের ভিড়

শ্রিংলা বললেন জড়িত হওয়ার সুযোগ নেই

গণফোরামে সাবেক ১০ সেনা কর্মকর্তা

‘প্রশাসন-পুলিশের ভূমিকা পক্ষপাতমূলক নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি হয়নি’

নারায়ণগঞ্জে সাত খুন মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

আমজাদ হোসেনের শারীরিক অবস্থার অবনতি