কৃষকের নামে ভুয়া ঋণ

লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিলো কৃষি ব্যাংক কর্মকর্তারা

শেষের পাতা

শামীম হোসেন বাবু, কিশোরগঞ্জ (নীলফামারী) থেকে: | ১৭ মে ২০১৮, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:৪৭
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক শাখা থেকে শত শত কৃষকের নামে ঋণ হালনাগাদ (রিকভারি) ও নতুন ঋণ করার নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। ফলে ব্যাংকের ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছে ঋণ গ্রহীতা কৃষক। এসব ঋণ গ্রহীতারা জানেন না তাদের নামে ব্যাংকে ঋণের পরিমাণ কত? এমনকি তাদের কাছে নেই কোনো  কাগজপত্রাদি। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ এক অডিট আপত্তিতে বিষয়টি ধরা পড়েছে। এ বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক ও দুর্নীতি দমন কমিশন বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন।
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক নীলফামারী কিশোরগঞ্জ উপজেলা শাখা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এ শাখা থেকে ৭৬৯ জন ঋণ গ্রহীতাকে ৫ কোটি ১৭ লাখ ৭২ হাজার টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে ১৫ জন ব্যবসায়ীকে সিসি লোন দেয়া হয় ৭৪ লাখ ৩০ হাজার। বাকি ৪ কোটি ৪৩ লাখ ৪২ হাজার টাকা ৭৫৪ জন কৃষকের মধ্যে বিতরণ করা হয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৬৯১ জন ঋণ গ্রহীতাকে ৫ কোটি ৪০ লাখ ৬১ হাজার টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়।
এর মধ্যে ১৭ জন ব্যবসায়ীকে সিসি লোন দেয়া হয় ৭২ লাখ ৪০ হাজার, বাকি ৪ কোটি ৬৮ লাখ ২১ হাজার ৬৭৪ জন কৃষকের মধ্যে বিতরণ করা হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ২৮১ জনের নামে ২ কোটি ৯৩ লাখ ১৩ হাজার টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে ২০ জন ব্যবসায়ীর নামে সিসি লোন ৮৭ লাখ ৫০ হাজার এবং  ২৬১ জন কৃষকের মধ্যে ২ কোটি ৫ লাখ ৬৩ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়।
সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক কিশোরগঞ্জ শাখায় ৪ জন ফিল্ড অফিসার থাকার কথা থাকলেও পদগুলো শূন্য থাকায় সিনিয়র কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক একাই সব দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে যোগদানের পর  ওই কর্মকর্তা প্রতিটি ইউনিয়নে দালাল নিযুক্ত করে দালালদের মাধ্যমে বিভিন্ন কৃষক ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ব্যাংকের তৎকালীন ম্যানেজার ফিরোজ মোহাম্মদ ফারুক সহ এসব ঋণ বিতরণ করেছেন। বর্তমানে তৎকালীন ব্যাংক ম্যানেজার ফিরোজ মোহাম্মদ ফারুক রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলায় কর্মরত।
কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের কেশবা গ্রামের ইউছুফ আলীর ছেলে আজাহার আলী (৫২) বলেন, গত ২০১৬ সালে মার্চ মাসে ব্যাংকে ঋণ করতে গেলে ব্যাংকের সুপারভাইজার আব্দুর রাজ্জাক তাকে জানান তার কাগজপত্রে সমস্যা থাকায় তাকে ঋণ দেয়া যাবে না। তাই নিরুপায় হয়ে ব্যাংকের দালাল ফারুক আহম্মেদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে ফারুক আমাকে জানায়, আপনি চলে যান আপনার ঋণের ব্যবস্থা আমি করবো। কয়েকদিন পরে ফারুক আমাকে বলে আপনার নামে ৪০ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে। কিন্তু ওই দালাল ফারুক আমাকে প্রথম দফায় ১২ হাজার ও দ্বিতীয় দফায় ৮ হাজার টাকা দিয়ে বলে বাকি টাকা ব্যাংকে খরচ হয়ে গেছে। আমি অনেক কান্নাকাটি করলে সে বাকি টাকা তো দেয়নি এমনকি আমার ঋণের কাগজপত্র চাইলে দুই বছর ধরে কোনো কাগজপত্র দিচ্ছে না।
চাঁদখানা ইউনিয়নের দক্ষিণ চাঁদখানা  দহবন্দ গ্রামের দেবেন্দ্র নাথ রায়ের ছেলে সেল্লাই চন্দ্র রায় (৪৫) বলেন, ২০০৯ সালে  ব্যাংকে আমি ১০ হাজার টাকা ঋণ করেছিলাম। ১০ হাজার টাকার মধ্যে আমি পেয়েছিলাম ৫ হাজার টাকা। পরে আবারো ব্যাংকের দালাল মোস্তফা আমাকে জানান, ব্যাংকের লোন পরিশোধ না করলে মামলা হবে। তাই আবারো ২০১৭ সালে আমার নামে পূর্বের ঋণ হালনাগাদ করে ৩০ হাজার টাকা ঋণ করে আমাকে শুধু তিন হাজার টাকা দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমাকে কোনো কাগজপত্র দেয়নি।
ব্যাংকের দালাল ফারুক হোসেন, দুলাল হোসেন, মোস্তফা তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, ব্যাংকের অফিসাররা সরাসরি টাকা না নিয়ে ঋণ গ্রহীতাদের আবেদনের বিভিন্ন ভুল ধরেন। পরে ঋণ নিতে আসা কৃষক আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমরা কাজ করে দিলে তারা কিছু টাকা দেয়। এটা দোষের কি? আর সুপারভাইজার আব্দুর রাজ্জাক স্যার যে রেজওয়ান নামে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে প্রতি হাজারে ২০ টাকা সুদ নিয়ে কৃষকদের লোন রিকভারি করে দেন।
 ব্যবসায়ী রেজওয়ানের সঙ্গে কথা বললে তিনি টাকা দিয়ে মুনাফা নেয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, ব্যাংকে আমার সিসি  লোন আছে সেই সুবাধে সুপারভাইজার আব্দুর রাজ্জাক টাকা নেয়। পরে মুনাফাসহ দিয়ে দেন।
এ বিষয়ে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক শাখার ফিল্ড সুপারভাইজার আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে কথা বললে তিনি সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন। বলেন- আমি ঋণ বিতরণের নামে কোনো কৃষকের কাছে টাকা নেইনি। কেউ যদি আমার কথা বলে টাকা নেয় সে দায় আমার নয়। তাছাড়া কোনো কৃষককে আমি ঋণ দিতে পারি না। ঋণ দেন ব্যাংকের ম্যানেজার।
তৎকালীন ব্যাংক ম্যানেজার ও বর্তমানে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক শাখার ম্যানেজার ফিরোজ মোহাম্মদ ফারুক বলেন, ব্যাংকে কার বিষয়ে কোনো আপত্তি এসেছে সেটা আপনি কেমন করে জানেন? এটাতো ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আপনি কে, আপনাকে কেন বলবো।
চাঁদখানা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাফিজার রহমান হাফু বলেন, আমার ইউনিয়নের অনেক অসহায় দরিদ্র মানুষের নামে কৃষি ব্যাংক থেকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করার জন্য।
 রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, কিশোরগঞ্জ শাখার ম্যানেজার আফজালুল হক চৌধুরীর সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, আমি এ শাখায় ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের  ১৫ তারিখে যোগদান করেছি। পূর্বে কে কি অনিয়ম করেছে সে বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারবো না।  কতজন কৃষকের ঋণের বিষয়ে অডিট আপত্তি এসেছে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যে সমস্ত কৃষকের মধ্যে হালনাগাদ (রিকভারি)  ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল তাদের মধ্য থেকে কিছু কৃষকের নামে ব্যাংকের  অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা দল কর্তৃক আপত্তি এসেছে বলে ।
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের নীলফামারী জোনাল ম্যানেজার আমিনুল হকের সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ আসলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য শওকত আলী চৌধুরী বলেন, যে সমস্ত ব্যাংক কর্মকর্তা কৃষকের নামে ঋণ দিয়ে টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যাংকের এজিএম ও ডিজিএম বরাবর অভিযোগ দিলে যদি তারা ব্যবস্থা না নেয় তাহলে বিষয়টি আমি সংসদে উপস্থাপন করবো।






এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

হাফিজ জামিল

২০১৮-০৫-১৬ ২১:৪২:২৮

বাংলাদেশ এখন চোরের কারখানায় পরিনত হয়ে গেছে তার কারন কোরানের শাষন নেই।

আপনার মতামত দিন

খালেদার গুলশান কার্যালয়ের ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্নের অভিযোগ

মাদার অব হিউম্যানিটি পদক প্রদানের সিদ্ধান্ত

খালেদার সাজা স্থগিতের আবেদন

তারেকের ব্যাপারে ইসির কিছু করার নেই

আওয়ামী লীগের প্রার্থিতা এখনো চূড়ান্ত হয়নি

ভালো প্রার্থীদের জামিন না দিয়ে শুনানি বিলম্ব করা হচ্ছে

ছাত্রদল নেতার পরিবারের আর্তি

বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল

বিবিসি’র প্রেরণাদায়ী নারীর তালিকায় সেই মা

সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সব সমন্বিত পরিকল্পনা নিন

দ্বিতীয় দিনের মতো বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার, নেতাকর্মীদের ভিড়

শ্রিংলা বললেন জড়িত হওয়ার সুযোগ নেই

গণফোরামে সাবেক ১০ সেনা কর্মকর্তা

‘প্রশাসন-পুলিশের ভূমিকা পক্ষপাতমূলক নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি হয়নি’

নারায়ণগঞ্জে সাত খুন মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

আমজাদ হোসেনের শারীরিক অবস্থার অবনতি