নি র্বা চ নী হা ল চা ল, দিনাজপুর ৫

কোন্দলে আওয়ামী লীগ বিএনপির একক প্রার্থী

শেষের পাতা

শাহ্‌ আলম শাহী, দিনাজপুর থেকে | ২২ এপ্রিল ২০১৮, রোববার | সর্বশেষ আপডেট: ৩:১৭
পার্বতীপুর ও ফুলবাড়ী উপজেলা নিয়ে গঠিত দিনাজপুর-৫ আসন। আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি এ আসনটিতে আগামী নির্বাচন ঘিরে কোন্দল মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। একাধিক দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী মাঠে নেমেছেন। তবে বিএনপির একক প্রার্থী দাপটের সঙ্গে আছেন এ আসনটিতে। রাজনৈতিক বৈরী পরিবেশেও দিনাজপুর-৫ এ নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। উন্নয়ন ও শুভেচ্ছা সংবলিত বিলবোর্ডে ছেয়ে গেছে গোটা নির্বাচনী এলাকা।
মনোনয়ন প্রত্যাশীরা গণসংযোগ করছেন। রং-বেরঙের পোস্টার-ব্যানার সাঁটিয়ে নির্বাচনে প্রার্থিতা জানান দিচ্ছেন তারা।
পার্বতীপুরে দেশের একমাত্র বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি, কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, মধ্যপাড়া কঠিন শিলা প্রকল্প, উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় রেলওয়ে জংশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বড় প্রতিষ্ঠানের কারণে আলোচনায় পার্বতীপুর-ফুলবাড়ীর নাম। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে গুরুত্বপূর্ণ এ আসনের সংসদ সদস্য পদে প্রার্থী হওয়ার টার্গেট রয়েছে অনেকেরই। এরই মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা দল থেকে মনোনয়ন পাওয়ার আশায় শুরু করেছেন দৌড়-ঝাঁপ।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে শক্ত অবস্থানে আছেন আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার। তার বাড়ি ফুলবাড়ী উপজেলায়। এরই মধ্যে সভা-সমাবেশসহ সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে এগিয়ে আছেন ছয়বারের এই এমপি।
কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে সরব রয়েছেন মাঠে। তবে পরিবারের সদস্যদের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় এমপি ফিজারকে নিয়ে দুই উপজেলার নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। অপরদিকে মনোনয়ন প্রত্যাশী কয়েকজন তরুণ নেতাও সভা-সমাবেশ করছেন।
বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে জেলার আহ্বায়ক সাবেক এমপি শিল্পপতি এজেডএম রেজওয়ানুল হকের নাম শোনা যাচ্ছে। দলের একক প্রার্থী হিসেবে তিনি মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। এ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে জামায়াতের কারো নাম শোনা যায়নি। জোট হলে বিএনপির বাক্সে জামায়াতের ভোট পড়বে- এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে জাতীয় পার্টি (জাপা)’র একক মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন জাপার কেন্দ্রীয় সদস্য ও জেলা জাপার তরুণ নেতা সোলায়মান সামি। মনোনয়ন পাওয়ার আশায় দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে কেন্দ্রে যোগাযোগ অব্যাহত রেখে মাঠে কাজ করছেন তিনি।
এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে এমপি অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার ছাড়াও অন্যরা হলেন পার্বতীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দুল আলম শান্ত, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক মাহমুদুন্নবী চৌধুরী, পার্বতীপুর পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ডা. এসএইচ সাজ্জাদ, দিনাজপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া জাকির ও যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সদস্য সফেদ আশফাক তুহিন। প্রত্যেকেই মনোনয়ন পাওয়ার আশায় আলাদাভাবে সভা-সমাবেশ করছেন।
বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছেন দিনাজপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সাবেক এমপি এজেডএম রেজওয়ানুল হক। এ ছাড়া ফুলবাড়ী উপজেলার বাসিন্দা, সাবেক এমপি ও এরশাদ সরকার আমলের প্রতিমন্ত্রী মর্যাদার শিক্ষা উপদেষ্টা মুক্তিযোদ্ধা মনসুর আলী সরকারও মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে।
মূলত এ আসনে মাত্র দুইবার ছাড়া প্রতিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে নবগঠিত বিএনপি প্রার্থী মনসুর আলী সরকার একবার এ আসনে বিজয়ী হন। এ ছাড়া ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী হন বিশিষ্ট শিল্পপতি এজেডএম রেজওয়ানুল হক। এর পর থেকে টানা এ আসন আওয়ামী লীগেরই দখলে রয়েছে। আর এর মূল নায়ক অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার। তিনি ছয় বার এমপি নির্বাচিত হন। এলাকায় তার জনপ্রিয়তাও তুঙ্গে। ২০০৯ সালের নির্বাচনে জিতে প্রথমে পরিবেশ ও বন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরে ভূমি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১৪-এর নির্বাচনে জিতে দায়িত্ব নেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। তবে ফিজারের পরিবারের লোকজনের কারণে সমপ্রতি তার বিরুদ্ধে নাখোশ দলের তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী। ফিজারের বিষয়ে ফুলবাড়ী ও দিনাজপুরের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অতীতে মন্ত্রীর যে সুনাম ছিল, বর্তমানে তা নেই। তার ভাই, স্ত্রী, মেয়ে ও জামাতার কারণে এমপির সেই সুনাম নষ্ট হয়েছে। তারা বলছেন, মন্ত্রী গত সাত বছর নেতাকর্মী-সমর্থকদের চেয়ে নিজেকে ও তার পরিবারকে নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিলেন, যে কারণে তিনি জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারেননি। এখন তরুণ প্রজন্মের নেতারাই দলের কাজ করছেন। চেষ্টা করছেন দল গুছানোর।
আওয়ামী লীগের তৃণমূল কর্মী সোহরাব হোসেন বলেন, ‘প্রার্থী যাকেই করা হোক না কেন, সেই জিতবে আওয়ামী লীগ থেকে। তবে শর্ত হচ্ছে আগে দলের ভেতর থেকে দলীয় কোন্দল নিরসন করতে হবে।’
আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী দিনাজপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ফুলবাড়ীর বাসিন্দা জাকারিয়া জাকির বলেন, বারবার এমপি হওয়ার পরও মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন এমপি। তবে পার্বতীপুর পৌর শহরের নেতা আমজাদ হোসেন বলেন, এ আসনে এমপি ফিজারের প্রয়োজন আছে। নেতা ও ব্যক্তি হিসেবে তিনি এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। তার বিকল্প কোনো নেতা এখনো তৈরি হয়নি।
হরিরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মাছুদুর রহমান শাহ্‌ বলেন, ‘ক্ষমতা পাওয়া না পাওয়া নিয়ে উপজেলা পর্যায় ও ছিন্নমূলের কিছু নেতাকর্মীর ক্ষোভ রয়েছে তার ওপর। যে যত কথাই বলুক মনোনয়ন পাবেন এমপি মোস্তাফিজুর রহমানই। দুই উপজেলায় ব্যক্তিগত ইমেজ রয়েছে তার। তিনি এখন মনের দিক দিয়ে তরুণ। ’
যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম নেতা সফেদ আশফাক তুহিন বলেন, ‘পর পর দুইবার মন্ত্রী হওয়ার পর তিনি (ফিজার) জনগণের মন জয় করতে ব্যর্থ হয়েছেন। দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের দূরে রেখেছেন। কর্মীদের মূল্যায়ন না হওয়ায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পরও নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রাপ্তি মেলেনি। এতেও নেতাকর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। এ অবস্থায় আগামী একাদশ জাতীয় নির্বাচনে কঠিন অবস্থার মুখোমুখি হতে পারেন বর্তমান এমপি।
মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। বলেন, আমি এলাকার এমপি, জনগণ ভোট দিবে আমাকে। আমার পরিবারের লোকজনকে নয়। কারো যদি আমার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকে। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিক। মুখে বললে হবে না। মুখে মানুষ অনেক কথাই বলে।
তিনি দিনাজপুর জেলা শহরের এক প্রভাবশালী নেতার নাম উল্লেখ করে বলেন, ‘সে এসব মিথ্যা অভিযোগ তুলে তার লোকদের দিয়ে বলাচ্ছে। তার যদি এতোই জনপ্রিয়তা- তাহলে আমার এলাকায় এসে মিটিং ডাকুক, আর আমিও মিটিং ডাকবো। দেখবো কার কত লোক। কার কত জনপ্রিয়তা। পিচ্ছি পোলাপানদের আমার পিছে লেলিয়ে দিয়েছে। সে নিজে আমার এলাকায় নির্বাচন করে দেখাক, তার কত পাওয়ার!’
এদিকে বিএনপি নেতা এজেডএম রেজওয়ানুল হকের বিপুল জনসমর্থন রয়েছে তৃণমূল পর্যায়ে। ফলে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীর মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী সাবেক এমপি এজেডএম রেজওয়ানুল হক বলেন, ‘আন্দোলন সংগ্রামসহ বিএনপির দুর্দিনে দলের সঙ্গেই আছি। জাতীয় স্বার্থে বিএনপি যদি নির্বাচনে যায় তাহলে দলের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেব।’ সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপির প্রার্থীর অনুকূলেই জনসমর্থন থাকবে বলে দাবি করেন তিনি।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন