জাকারবার্গকে বেকায়দায় ফেলতে পারেনি সিনেট

বিশ্বজমিন

ডিলান বাইয়ার্স | ১২ এপ্রিল ২০১৮, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৮:১৫
মঙ্গলবার মার্কিন সিনেটে শুনানি শেষে অক্ষতই বেরিয়ে আসতে পেরেছেন ফেসবুকের প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ। তাকে যেসব সিনেটর প্রশ্ন করেছেন, তাদের বেশিরভাগই বোঝেন না ফেসবুক আসলে কীভাবে কাজ করে। ফেসবুক নিয়ে যে সমস্যা তার সমাধানই বা কী। এমনকি কী উদ্দেশ্যে ফেসবুকের প্রধান নির্বাহীকে স্বাক্ষ্য দিতে আমন্ত্রণ জানানো হলো, সেটিই তারা জানেন না। জাকারবার্গের শুনানির প্রথম দিনে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে আমেরিকার বহু আইনপ্রণেতাই একুশ শতকের প্রযুক্তি নিয়ে অজ্ঞ।
ফলস্বরূপ, যেই ইস্যুটি এই শুনানির কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার কথা ছিল, সেই ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং ডিজিটাল ডাটার অপব্যবহার আর দশটি ইস্যুর মতোই সাদামাটাভাবে আলোচিত হয়েছে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে পুরো জাতির যখন বুদ্ধিদীপ্ত বিতর্কের প্রয়োজন ছিল, তার বদলে জাতি দেখেছে আঁকাবাঁকা সব প্রশ্ন আর ভুল জায়গায় আক্রমণ।
অবশ্য কিছু ব্যতিক্রম যে ছিল না তা নয়।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর কামালা হ্যারিস। ফেসবুক-মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্মের বাইরেও ব্যবহারকারীদের অনলাইন কর্মকান্ডকে কতটা বিস্তৃতভাবে অনুসরণ করেছে ফেসবুক? কেন ২০১৫ সালেই ব্যবহারকারীদের জানানো হয়নি যে, ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা তাদের তথ্য হাতিয়ে নিয়েছে? এই দুই প্রশ্নের সমুচিত ব্যাখ্যা দিতে পারেননি জাকারবার্গ। আর এ নিয়ে কামালা হ্যারিস বেশ চেপে ধরেছিলেন তাকে।
কিন্তু এর বাইরে মনে হয়েছে যে, আইনপ্রণেতারা জাকারবার্গকে খুবই সাধারণ মৌলিক সব প্রশ্ন করছেন। ফেসবুক আসলে কীভাবে কাজ করে, সেই ব্যাপারে প্রশ্ন করেছেন। বেশ কিছু প্রশ্ন শুনে মনে হয়েছে প্রশ্নকর্তা সিনেটররা ফেসবুক ও এর ব্যবসায়িক-মডেল সম্পর্কে মৌলিক ধারণাও রাখেন না।
সিনেটর অরিন হ্যাচ যেমন জিজ্ঞেস করেছেন, ‘আপনাদের ব্যবসায়িক মডেলটা টিকে আছে কীভাবে, যখন ব্যবহারকারীরা আপনাদের সেবার জন্য পয়সা দেন না?’ জাকারবার্গ কিছুটা বিস্মিত হয়ে জবাব দিলেন, ‘সিনেটর, আমরা বিজ্ঞাপন দেখাই।’ সিনেটর ডেব ফিশার জিজ্ঞেস করেন, ‘কত ধরণের উপাত্ত (ডাটা ক্যাটাগরি) সংগ্রহের পর ফেসবুক সংরক্ষণে রাখে?’ হতবম্ব ফেসবুকের প্রধান নির্বাহী পালটা জিজ্ঞেস করেন, ‘সিনেটর, আপনি কি আরেকটু ¯পষ্ট করতে পারবেন যে ডাটা ক্যাটাগরি বলতে আপনি কী বোঝাচ্ছেন? আমি আসলে বুঝতে পারছি না, এটার মানে কী।’
তবে সবচেয়ে স্মরণীয় বাদানুবাদের একটি ছিল সিনেটর জন কেনেডির সঙ্গে। সিনেটর কেনেডি তার বক্তব্য শুরু করেন এই বলে যে, ফেসবুকের ইউজার অ্যাগ্রিমেন্ট খুবই বিরক্তিকর। তারপর তিনি তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষায় ফেসবুককে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু জাকারবার্গ তাকে প্রতিবারই মনে করিয়ে দেন যে, এসব পদক্ষেপ ইতিমধ্যেই ফেসবুকের নেওয়া আছে। তাদের কথোপকথন দেখে নেওয়া যাক।
কেনেডি: ‘আপনি কি আমাকে আমার উপাত্ত (ডাটা) মুছে ফেলার আরও বেশি অধিকার দেবেন?’
জাকারবার্গ: ‘সিনেটর, আপনি এখনই চাইলে আপনার যেকোনো ডাটা মুছে ফেলতে পারবেন, চাইলে সব ডাটাই মুছে ফেলতে পারেন।’
কেনেডি: ‘আপনি কি আমাকে এই অধিকার দিতে রাজি যাতে আমি আমার ডাটা অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার না করতে আপনাকে বারণ করতে পারি?’
জাকারবার্গ: ‘সিনেটর, আবারও বলছি, আপনার ডাটা নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার শুধুই আপনার...’
কেনেডি: ‘আপনি কি আমাকে এই অধিকার দিতে প্রস্তুত যাতে আমি ফেসবুক থেকে আমার ডাটা অন্য কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরিয়ে ফেলতে পারি?’
জাকারবার্গ: ‘সিনেটর, আপনি এখনই তা করতে পারেন।’
সিনেটরদের এই অজ্ঞতার ফলে জাকারবার্গ আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব দেওয়া থেকে বেঁচে গেছেন। বিশেষ করে, ফেসবুকের ডাটা নজরদারি কতটা বিস্তৃত এবং কেন ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ব্যবহারকারীদের ডাটার ব্যবহার ও অপব্যবহার নিয়ে আরও স্বচ্ছ ছিল না, এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা দরকার ছিল।
এছাড়া সিনেটররা ছন্নছাড়া ছিলেন। তারা যেসব প্রশ্ন করেছেন সেখানে ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারাভিযানে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ, বিদ্বেষপ্রসূত বক্তব্যের প্রচার, নির্বাচনী বিজ্ঞাপনে স্বচ্ছতার অভাব উঠে এসেছে। এই সব ইস্যুই সাম্প্রতিক। কিন্তু প্রত্যেকটি ইস্যুই আলাদা। এর সমাধানও আলাদা।
ডাটার গোপনীয়তার ইস্যুতে, সিনেটররা অনেকটা ব্যাখ্যা চেয়েছেন যে, কেন ব্যবহারকারীরা ফেসবুককে বিশ্বাস করবেন। কিন্তু তাদের বরং জানতে চাওয়া দরকার ছিল যে, নিজের ডাটার ওপর ও এই ডাটা কীভাবে আরেক পক্ষের সঙ্গে শেয়ার করা হবে, তার ওপর অধিকতর নিয়ন্ত্রণ ব্যবহারকারীদেরকে দিতে ফেসবুক কী পদক্ষেপ নিয়েছে?
এসবের ফলে জাকারবার্গ বারবার একই কৌশল অবলম্বন করেছেন। তিনি দায় নিয়েছেন এবং সবকিছুকে আরও সুরক্ষিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বেঁচে গেছেন। কিন্তু সিনেটররা তাকে চেপে ধরে জিজ্ঞেস করেননি যে, এই কাজ তিনি এক বছর আগে কেন করেননি?
পুরো শুনানিতে শুধুমাত্র একবারই হয়তো তিনি চাপে ছিলেন, যখন কামালা হ্যারিস তাকে জিজ্ঞেস করেন, কেন ২০১৫ সালেই ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার বিষয়টি ফেসবুক প্রকাশ করেনি? কেন এই বছর গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর ফেসবুক তা স্বীকার করেছে?
হ্যারিস তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘ফেসবুকের নেতৃত্বস্থানীয় কেউ কি এমন কোনো আলোচনায় সম্পৃক্ত ছিলেন যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে বিষয়টি প্রকাশ করা হবে না? নাকি, আপনি মনে করেন এই ধরণের আলোচনা কখনই হয়নি।’ জাকারবার্গ জবাবে বলেন, ‘আমি আসলে নিশ্চিত নই আদৌ এ ধরণের আলোচনা হয়েছে কিনা।’
অন্যান্য সিনেটররা দৃশ্যত কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন করার ধরণ ত্রুটিপূর্ণ ছিল বিদায় জাকারবার্গ এড়িয়ে যেতে পেরেছেন। একটি প্রশ্ন ছিল মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে ফেসবুকের বিজ্ঞাপনী আয় প্রসঙ্গে। এই প্রশ্ন জাকারবার্গ এড়িয়ে যেতে পেরেছিলেন কারণ ফেসবুক এই ডাটা বিক্রি করে বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন সিনেটররা। বিষয়টি টেকনিক্যালি সঠিক নয়। ফেসবুক ডাটা বিক্রি করে না সরাসরি, তবে এই ডাটা দিয়ে ব্যবসা করে।
আইনজীবী, পরামর্শক ও উপদেষ্টারা কড়াভাবে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন জাকারবার্গকে। শুনানির সময় তিনি ছিলেন শান্ত। প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সময় শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে তাকে তেমন চ্যালেঞ্জের মুখেই পড়তে হয় না। জাকারবার্গ কি ভুলের দায়িত্ব নিয়েছেন? তিনি নিয়েছেন। ফেসবুক কি ব্যবহারকারীদের কনটেন্ট সুরক্ষার জন্য দায়বদ্ধ? হ্যাঁ। ফেসবুক কি সরকারী নিয়ন্ত্রণের জন্য উন্মুক্ত? হ্যাঁ।
যখনই কোনো আইনপ্রণেতা জিজ্ঞেস করেন যে ফেসবুক এই জিনিসটি ভুল করেছে, তখনই জাকারবার্গ বলতে শুরু করেন ওই ভুল সংশোধনে তার কোম্পানি কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছে। অথচ, তাকে বলা যেত, আগেই কেন এসব পদক্ষেপ ফেসবুক নেয়নি? যখনই তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েছেন, তখনই তিনি পরে আইনপ্রণেতাদেরকে এই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পার পেয়েছেন।
পুরো শুনানিতে জাকারবার্গ যে কতটা অক্ষত ছিলেন সেটি ধরা পড়ে তখন, যখন তাকে বিরতি নেয়ার সুযোগ দেওয়া হলে তিনি জবাবে বলেন, ‘আরও ক’টা প্রশ্ন করলেও সমস্যা নেই।’
(সিএনএন)

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

তিন সিটিতে সুষ্ঠু ভোট কারচুপির আভাস দিয়েছেন ওবায়দুল কাদের

আমাদের কান চিলেই নেয়...

ইউনাইটেড মাল্টিট্রেড মার্কেটিং গ্রুপের চেয়ারম্যানসহ দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে দুদক

রাতের উল্লাসে ফরাসি চুম্বন

সেন্ট্রাল হাসপাতালে ফের ভুল চিকিৎসায় শিশু মৃত্যুর অভিযোগ

কোটা আন্দোলনের নেতা তারিক নিখোঁজ

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তাারি পরোয়ানার আবেদন

ট্রাম্প-পুতিনের বৈঠক নিয়ে জল্পনা

উখিয়ায় ট্রাক উল্টে নিহত ৫

তবুও বীরের বেশে ফিরবেন মদরিচরা

এ রকম ফাইনাল আগে কখনো হয়নি

কুষ্টিয়ায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মাদক ব্যবসায়ী নিহত

ছবিতে পরাজিত ক্রোয়েশিয়া সমর্থকরা

ইমানুয়েল-কোলিন্দার ফ্রেঞ্চ কিস (ভিডিও সহ)

ছবিতে ফ্রান্সের বিশ্বকাপ বিজয়

মাতোয়ারা ফ্রান্স, লুটপাট, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ