নির্যাতনের বর্ণনা দিলেন পরিবারের সদস্যরা

শেষের পাতা

স্টাফ রিপোর্টার, টঙ্গী থেকে | ১৫ মার্চ ২০১৮, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:২৯
কারাগারে নিহত ঢাকা মহানগর ছাত্রদল নেতা জাকির হোসেন মিলনের ওপর রিমান্ড নির্যাতনের মর্মন্তুদ বর্ণনা দিয়েছেন তার চাচা মোহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহ। জাকিরের মরদেহে নির্যাতনের চিহ্নগুলো দেখে এখন নিজেরাই আতঙ্কিত। গতকাল ওয়ালি উল্লাহ সাংবাদিকদের বলেছেন, আমার ভাতিজাকে মেরে ফেলা হয়েছে। আমার ভাতিজাকে কিভাবে মারা হয়েছে তা আপনারা জানতে চাচ্ছেন। নির্মম হত্যার বর্ণনা যদি দেই তাহলে আমাকে নিয়েও মেরে ফেলা হবে। তখন আপনারাই আবার ক্যামেরা নিয়ে আমার ছবি উঠাতে আসবেন। পুরো পরিবারটাকে নিঃশেষ করে দেয়া হবে। জাকিরের শরীরে আঘাতের চিহ্নের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, নির্যাতনের মাধ্যমে জাকিরের হাতের আঙ্গুলগুলো অনেকটা ছিন্নভিন্ন করে ফেলা হয়েছে।
কোনো মানুষ এ ধরনের নির্যাতন করতে পারে বলে আমার জানা ছিল না। ওয়ালি উল্লাহ বলেন, আমার ভাতিজাকে যখন প্রিজনভ্যানে করে কারাগারে নেয়া হচ্ছিল তখন তাকে বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। সে আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল। তার দু’চোখ দিয়ে তখন পানি ঝরছিল। তখন তার শরীরের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেছিল- চাচা, আমার জন্য দোয়া করবেন। আমি হয়তো বাঁচবো না। আমার ওপর খুব অত্যাচার করা হয়েছে। আমার পরিবারের কাউকে এ অত্যাচারের কথা বলবেন না। যদি আমার মা, বোনেরা এসব কথা শুনতে পায় তাহলে তারা আমার জন্য দুঃশ্চিন্তা করবে। আর আমি যদি মারা যাই, আমার দুই মেয়েকে আপনারা একটু দেখে রাইখেন। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে মিলনের ওপর নির্যাতনের এভাবেই বর্ণনা দিয়েছেন তার চাচা। তার এ বক্তব্য শুনে সেখানে উপস্থিত কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। ভাতিজার মৃত্যুর খবর পেয়ে গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুর থেকে আসা জাকিরের আরেক চাচা আহসান উল্লাহ ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, আমার ভাতিজার রাজনীতি করা কি অপরাধ ছিল? তাকে অত্যাচার করে মারা হয়েছে। তার কোমর থেকে নিচের অংশ সম্পূর্ণ কালো কালো দাগ ছিল। এতে বোঝা যায় সে নির্মম নির্যাতনের কারণে মারা গেছে। নিহত জাকিরের মা জ্যোৎস্না আরা খাতুন (৫৬) বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেছেন, রাজনীতি করায় আমার ছেলেকে হারিয়েছি। আল্লাহ একদিন তাদেরও বিচার করবেন। আমার মতো কোনো মা যেন এমনভাবে সন্তান হারা না হয়। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, স্বামীকে হারিয়েছি ২০০৯ সালে। দুই ছেলের মধ্যে ছোট ছেলে জাহিদ হোসেন লিটন গত ১৬ বছর আগে মালয়েশিয়া গিয়ে আর ফিরে আসেনি। তার কোনো খোঁজ খবর পাচ্ছি না। বড় ছেলে জাকিরের দিকে তাকিয়েই বেঁচে ছিলাম। শেষ বয়সে এসে ছেলেকে কবর দিতে হলো। জাকিরের স্ত্রী শাহানাজ আক্তার তানিয়া স্বামীর মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে নির্বাক হয়ে গেছেন। দু’চোখ থেকে কেবল অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, নির্মম নির্যাতন করে আমার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। আমার স্বামীর কোনো দোষ ছিল না। তার একটাই অপরাধ, তিনি বিএনপির রাজনীতি করতেন। সে কারণেই তাকে জীবন দিতে হয়েছে। তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে প্রশ্ন রেখে বলেন, রাজনীতি করা কি অপরাধ? রাজনীতি করলে একজন মানুষকে নিষ্ঠুর নির্যাতনের মাধ্যমে মেরে ফেলতে হবে তা আমার জানা নেই। আমার দুই মেয়ের বড়টি ১০ বছরের বাকপ্রতিবন্ধী জান্নাতুল মোয়াইয়া মাহি ও আড়াই বছরের আয়েশা জাকির। এখন আমি অবুঝ দুই মেয়েকে নিয়ে কোথায় যাবো? আমার এই দুই এতিম সন্তানকে কে দেখবে? এদেশে কি কারো কোনো কথা বলার অধিকার নেই? গতকাল বিকালে পুলিশি নির্যাতনে নিহত বিএনপি নেতা জাকির হোসেন মিলনের টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়কের মাজুখানের বাড়িতে যান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর। সে সময় মহাসচিবকে কাছে পেয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন মিলনের স্বজনেরা। তাদের কান্নায় ভারি হয়ে উঠে পরিবেশ। বিএনপি মহাসচিব অনেকক্ষণ মিলনের পরিবারের সদস্যদের পাশে বসে তাদের সান্ত্বনা দেন। বিএনপি মহাসচিব এ সময় মিলনের দুই ছোট মেয়েকে কাছে টেনে নিয়ে আদর করতে গেলে তারা কান্নায় ভেঙে পড়ে। দুই শিশু কন্যার কান্নায় অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ উপস্থিত নেতাকর্মীরাও। পরে দলের ভারপ্রান্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে আর্থিক অনুদানও পরিবারের সদস্যদের কাছে তুলে দেন বিএনপি মহাসচিব। এ সময় মির্জা আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, জাকিরকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। সরকার জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। জনগণকে সরকার ভয় পায়। মানুষের ন্যূনতম মানবিক যে অধিকারগুলো আছে সেগুলোকে সরকার গুরুত্ব দেয় না। এ সরকার দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার বিরোধী কার্যকলাপ করছে। এই নির্যাতন নিপীড়নের মধ্য দিয়ে সরকার বিরোধী দলকে দমন করে মানুষের ন্যায্য অধিকারগুলো হরণ করে ক্ষমতায় টিকে থাকছে। জাকিরের পরিবার এখন অসহায় অবস্থায় আছে। তার মা, স্ত্রী ও দুই সন্তান নিদারুণ কষ্টের মধ্য পড়ে গেল। এমন হাজারো পরিবার আজ সারা বাংলাদেশে যারা গণতন্ত্রকে দেখতে চায় তাদের এমন পরিণতি হচ্ছে। জাকিরের পরিবারের জন্য যথাসাধ্য করবে বিএনপি। তার সন্তানদের পাশে থাকবে বিএনপি। স্থানীয় নেতৃবৃন্দকেও মিলনের পরিবারের প্রতি দেখভাল করার নির্দেশ দেন তিনি। পুলিশি হেফাজতে ছাত্রদল নেতা মিলনের মৃত্যুর ঘটনাকে ‘সরকারের চরম নির্মমতা’ হিসেবে অভিহিত করেন মির্জা আলমগীর। এর আগে মির্জা আলমগীর দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে নিহত জাকির হোসেন মিলনের কবর জিয়ারত করেন। কবরে দলের কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন তিনি। এ সময়ে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, সমাজ কল্যাণ সম্পাদক কামরুজ্জামান রতন, নির্বাহী কমিটির সদস্য সাঈদ সোহরাব, গাজীপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী সাইয়্যেদুল ইসলাম বাবুল, স্থানীয় কমিশনার সুলতান উদ্দিন চেয়ারম্যান, ছাত্রদল নেতা সাজ্জাদ হোসেন রুবেল, নুরুল ইসলাম নুরুসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, গত ৬ই মার্চ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিএনপির মানববন্ধন থেকে মিলনকে আটক করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এরপর তিন দিন রিমান্ড শেষে রোববার কারাগারে নেয়ার পর রাতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন মিলন। সোমবার সকালে তাকে কারাগার থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নেয়ার পর চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Nur

২০১৮-০৩-১৫ ১৬:৫০:১৪

No.... problem for them. This news won't be come again in news paper.

nurul alam

২০১৮-০৩-১৫ ১৫:২৩:২৮

এ যদি হয় দেশ শাসন তাহলে দু:শাসন কী ? আর এসবের যখন সমালোচনা বা প্রতিবাদ করা হয় তার/তাদের ভাগ্যে জোটে গুম, মামলা, গ্রেফতার, নির্যাতন আরো কত কি । কেন ? এসব সংবিধানের কোন ধারায় লিপিবদ্ধ আছে তা পুলিশ কিংবা তাদের রক্ষক কিংবা তাদের পালনকারীদের জবাব দিতে হবে । নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা এভাবে একটা রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীকে হত্যা করে ফেলবে এটা কোন ভাবেই মেনে নেয়া যায় না । বিরোধী রাজনৈতিক দলের যে কাউকে গ্রেফতার করেই রিমান্ড নামের মর্মান্তিক নির্যাতন কিসের আলামত ? এভাবে আর কতদিন চলবে ?

Citizen

২০১৮-০৩-১৫ ১৫:১৯:০৬

I am afraid to live in this country- my homeland, birth place.

Anni akter

২০১৮-০৩-১৪ ২৩:০১:৩৫

কি লিখবো বুৃজতে পারছিনা,দোচোখের পানি ঝরছে আমার,শুধু একটি কথা বলবো পৃথীবির কোনও দেশে এমন রাজনীতি নেই কিংবা প্রশ্রাসন নেই যে বিরুদ্ধী কোনও নেতাকে কিংবা বিরুদ্ধী কোনও রাজনীতি বীদকে এভাবে পুলিশ ধরে নিয়ে নির্যাতন করে মেরে ফেলবে কিংবা মেরে ফেলে?

robiul

২০১৮-০৩-১৪ ২১:৫০:৫১

স্বজন হারা ব্যাথা আমি বুজি............? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এদেরকি স্বজন নেই?

হুমায়ন

২০১৮-০৩-১৪ ২০:৫৫:০৬

বাংলাদেশের কোন পুলিশ এমনটা করে করবে বলে আমার মনে হয় না। RAB কে যারা বন্দুক উচিয়ে Threat করেছিল এটা তাদেরই কাজ।

Ibraham

২০১৮-০৩-১৪ ২০:৪০:৪৭

মেরেই যখন ফেলবে তাহলে তাঁর হাত পায়ের বিশটি নখ উপড়ে ফেলতে হবে?একটি তপ্ত বুলেটও তো পারতো তরতাজা মিলনের নিশ্বাস চিরতরে রুখে দেয়ার জন্য!কী দরকার ছিল এতোটা পৈচাশিক নির্যাতন করার?

Abdul Hannan

২০১৮-০৩-১৪ ১৭:৪৯:৪১

এই ধরনের হত্যাকান্ড আইন শৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনীর জন্য বৈধ নাকি?

আপনার মতামত দিন

মন্ত্রীর পা ধরেও কাজ হয়নি

তিন মাসের ছুটিতে সৈয়দ আশরাফ

ঢামেকের ৬ কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করবে দুদক

সিরিয়ার ভুলে রাশিয়ার ১৫ সেনা নিহত

সচিব হলেন পাঁচ কর্মকর্তা

তিন প্রকল্পের উদ্বোধন করলেন হাসিনা-মোদি

এবার চালু হল হাইড্রোজেন রেলগাড়ি

আমীর খসরুর হোটেলে দুদকের অভিযান

‘গোরস্তানেও পুলিশ মোতায়েন করা উচিত’

খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেননি আইনজীবীরা

দেড় লাখ ইভিএম কেনার প্রকল্প অনুমোদন

বাফুফে থেকে নিপুর পদত্যাগ

১০০০ পিস ইয়াবাসহ আইন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা আটক

সরকারকে বুঝিয়ে দিতে হবে তারা শুধু জনগণের সেবক: ড. কামাল

ঢাবিতে কোটা আন্দোলনকারী ও ছাত্রলীগের পাল্টাপাল্টি মিছিল

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ১০ই অক্টোবর