‘জাইল্যাদের অখন না খাইয়া তাকতে অয়’

বাংলারজমিন

রাশেদ আহমদ খান, হবিগঞ্জ থেকে | ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, বুধবার
‘আজমিরীগঞ্জের জাইল্যাদের অখন না খাইয়া তাকতে অয়। খাল-বিল, গাং খগলতা অখন ইজারদারদের আতে (হাতে)। মাছ ধরবার জায়গা নাই। অখন আর আগের মতো মাছও নাই। তাই বাপ-দাদার পেশা বাদ দিয়া এখন মাটি কাটাত যাই। যা পাই তা দিয়া খাইয়া-না-খাইয়া কোনোভাবে চলছে সংসার।’
আক্ষেপের সুরে কথাগুলো বলছিলেন আজমিরীগঞ্জের জেলে ময়না মিয়া।
২ ছেলে ও ২ মেয়ে স্ত্রীসহ ৬ সদস্যের সংসার। পেটের জ্বালায় অন্যের জমিতে মাটি কাটতে যান ময়না মিয়া। দিনের শেষে ২৫০ টাকা নিয়ে ফিরেন ঘরে। এ টাকায় ৩ বেলা খাবারের জোগাড় হয় না। তাই বাধ্য হয়ে ভাবছেন ঢাকা বা চট্টগ্রামে গিয়ে কোন গার্মেন্টে শ্রমিকের কাজ করবেন। শুধু ময়না মিয়া না, এ এলাকার অধিকাংশ জেলেরা ভাবছেন জীবিকার তাগিদে এ পেশা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে। এরই মধ্যে অনেকে পরিবার নিয়ে চলে গেছেন দেশের বিভিন্ন স্থানে। এতে ক্রমশই বিলীন হতে চলেছে স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ের।
জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় হাওর রয়েছে ১৪ হাজার ৮৮৫ হেক্টর। ৩টি নদীর আয়তন ৫২০ হেক্টর। জলমহাল রয়েছে ৪৮৭ হেক্টর ও পুকুরের আয়তন ১১৫ হেক্টর। এসব নদী, হাওর, জলমহাল ও পুকুর থেকে প্রতিবছর মাছ উৎপাদন হয় প্রায় ৪ হাজার ৬৭৬ টন দেশীয় মাছ। এর মধ্যে হাওর থেকে উৎপাদন হয় ৩ হাজার ৭২০ টন মাছ। নদী থেকে উৎপাদন হয় ১শ’ ৫ টন, জলমহাল থেকে ৪শ’ ৫ টন ও পুকুর থেকে ৪৪৫ টন মাছ। উৎপাদিত এসব মাছের সিংহভাগই রপ্তানি করা হয় দেশের বিভিন্ন জেলায়। নদী সংস্কার ও সরেজমিন আজমিরীগঞ্জের বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকা ঘুরে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, এক সময় আজমিরীগঞ্জ ছিল এ অঞ্চলের মাছের রাজধানী। প্রচুর মাছ উৎপাদন হতো প্রত্যন্ত এ উপজেলায়। কিন্তু যোগাযোগের অভাবে এসব মাছ দূর-দূরান্তে রপ্তানি করতে পারতেন না মৎসজীবীরা। পায়ে হেটে কাঁধের ভাড়ে করে বানিয়াচং, হবিগঞ্জ শহরসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন বাজারে নিয়ে যেতেন জেলেরা। তখনকার সময়ে নদী ও হাওরে অবাধে মাছ ধরতে পারতেন জেলেরা। এতে সারাদিনে যে মাছ ধরতে পারতেন তা থেকে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে আরো বেশ কিছু মাছ বিক্রি করে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে পারতেন তারা। এর ফলে এ এলাকার প্রধান পেশা ছিল মাছ ধরা। এলাকার শতকরা ৮০ জন জড়িত ছিলেন মাছ ব্যবসায়। ৯০ এর দশকে স্থানীয় জাপা নেতা হাফাজ উদ্দিন আফাই মিয়া এখানে একটি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীতে এখান থেকে মাছ প্রক্রিয়াজাত করে দেশের বিভিন্ন স্থানে রপ্তানি করা হতো। জেলেরা মাছ ধরে এ কেন্দ্রে বিক্রি করে ভাল কামাই রোজগার করতে পারতেন। তবে কয়েক বছর পর আফাই মিয়া মারা গেলে এক পর্যায়ে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রটিও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকেই জেলেদের মাছের ব্যবসায় ধস নামে। তার উপরে পরবর্তীতে হাওর নদী, জলাশয় ইজারা প্রদান ও অবৈধ দখলদারদের কবলে চলে গেলে নিরুপায় হয়ে পড়েন জেলেরা। এছাড়া খননের অভাবে নদীগুলো নাব্য হারানোর কারণে ক্রমাগত কমতে থাকে মাছের উৎপাদন। এর ফলে পেটের তাগিদে বিকল্প পেশার দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন জেলেরা।
আজমিরীগঞ্জের নোয়াগড় গ্রামের জেলে পরিবারের গৃহবধূ মালতি পাল জানান, একবার আমরার জালে অত বড়... একটা চিতল মাছ ধরা পড়ছিল। খুন্তি দিয়া এই মাছের পাত্তি ফালাইছলাম আমরা। এরপর বাড়ির হগলে ভাগ কইর‌্যা মাছটা খাইছলাম। তিনি জানান, ‘এক সময় এই এলাকায় অনেক মাছ ধরা ফড়তো। বড় বড় রউ, কাতল, বোয়াল, চিতল মাছ মাইর‌্যা আনতা তাইনরা। ইতা মাছ পুলাফানরা খইয়াও বিক্রি করতা তারা। আর অখন বড় মাছ চউখেঐ দেখি না’। একই গ্রামের বৃদ্ধ জেলে জমির উদ্দিন জানান, ‘আগে নাও লইয়্যা বিল দিয়া যাইবার সময় বড় বড় মাছ ফাইল্যাইয়া নাওয়ে উইট্যা যাইতো। জাল ফালাইলে মাছের ভারে জাল টাইন্যা তুলতে ফারছি না। আর অখন আমরার নাতি-নসকারা বড় মাছ চউখেঐ দেখে না। আর মাছ মারবার জায়গাঐ কই। সগল জায়গাতো অখন মানুষরূপী বোয়ালদের ফেটে। মাছ মাইর‌্যা আর সংসার চালাইবার উফায় নাই। না খাইয়া মরতে অইবো।’ আজমিরীগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রমনী মোহন পাল মানবজমিনকে জানান, এ এলাকার নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় মৎস্য উৎপাদন ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। এছাড়া প্রকৃত মৎস্যজীবীরা নদী ও জলমহাল ইজারা না পাওয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে এ পেশার লোকজনের জীবন। তিনি জানান, প্রকৃত মৎস্যজীবীদের পুনর্বাসন ও তাদের জীবন মান উন্নয়নে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। নদী ও জলমহালের ইজারা সক্রিয় মাছ চাষিদের প্রদান করতে হবে। প্রয়োজনে তাদেরকে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করে মাছ চাষে আগ্রহী করতে হবে।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন