চট্টগ্রামে ওয়াকফ স্টেটের বিপুল পরিমাণ জমি হাতছাড়া

দেশ বিদেশ

ইব্রাহিম খলিল, চট্টগ্রাম থেকে | ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, মঙ্গলবার
চট্টগ্রাম মহানগরীর ইপিজেড এলাকায় ওয়াকফ স্টেটের বিপুল পরিমাণ জমি প্রভাবশালীদের দখলে। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে নানা কৌশলে এই সম্পত্তি ভোগ-দখল করে আসছেন প্রভাবশালীরা- এমন অভিযোগ ওয়াকফ এস্টেটের মোতোয়াল্লি ডা. জামান আহাম্মদের। তিনি বলেন, ওয়াকফ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে এ ব্যাপারে একাধিক আবেদন করেও প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। মোতোয়াল্লি হিসেবে এসব সম্পত্তি উদ্ধারের চেষ্টা করায় দখলদাররা আমার প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে।
ওয়াকফ প্রশাসন চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহকারী প্রশাসক মো. কামরুজ্জামান বলেন, এ সংক্রান্ত একটি ফাইল ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের কাছে কিছু কাগজ চাওয়া হয়েছে।
এসব পাওয়া গেলে তদন্তসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ওয়াক্‌ফ এস্টেটের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম নগরীর ইপিজেড এলাকায় মসজিদের নামে ফকির মোহাম্মদ সওদাগর ওয়াক্‌ফ এস্টেটের ১৭ একর জমি ছিল। ইপিজেডের অধিগ্রহণের পর অবশিষ্ট আছে ২.৭১ একর জমি। তম্মধ্যে প্রায় ৮২ শতক জমি ১৭ বছর ধরে স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে। যার বাজার মূল্য ২০ কোটি টাকারও অধিক।  
এছাড়া ইপিজেড মোড়ে সড়ক পাশের ১২ শতক জমিও ভোগ-দখলে রেখেছে চক্রটি। যার বর্তমান মূল্য প্রায় এক কোটি টাকা। পাশাপাশি আরও কিছু জায়গা জালিয়াতির মাধ্যমে দখল করে ১৫টি দোকান নির্মাণ করেছে ওই চক্র। যার মূল্য ৫ কোটি টাকারও বেশি। এতে ওয়াকফ এস্টেটের সাবেক মোতোয়াল্লি এলেম উদ্দিনের যোগসাজশ রয়েছে।   
তথ্যে বলা হয়, ২০১১ সালে ওয়াকফ এস্টেটের মোতোয়াল্লি এলেম উদ্দিনকে পরিবর্তনের পর ওয়ারীশরা খোঁজ নিলে সামনে চলে আসে প্রভাবশালী আবদুল কুদ্দস ও তার সহযোগীদের প্ররোচনায় নানা অনিয়মের ঘটনা।
ওয়াকফ এস্টেটের মোতোয়াল্লি ডা. জামান আহাম্মদ জানান, জায়গা দখলে রাখতে আবদুল কুদ্দুস ২০০২ সালে একটি ইজারা চুক্তিনামা করেন এলেম উদ্দিনের সঙ্গে। তিন বছরের জন্য সম্পাদিত ওই চুক্তিনামা তিন বছর পরপর নবায়নযোগ্য। শর্ত রাখা হয়, অগ্রিম ৫০ হাজার টাকা। প্রতি মাসে ভাড়া এক হাজার ৫০০ এবং অগ্রিম থেকে প্রতি মাসে কর্তন ৫০০ টাকা।
শর্তে উল্লেখ করা হয়, তফশিলের খালি জায়গায় দ্বিতীয় পক্ষ ভবন নির্মাণ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, টেলিফোন ইত্যাদি নিজ খরচে সংযোজন করতে পারবেন। দ্বিতীয় পক্ষের নির্মিত গৃহাদিতে চুক্তি নবায়নক্রমে নিজে কিংবা ভাড়াটিয়া ভোগ-দখল করতে পারবেন। তাতে আমি (এলেম উদ্দিন) কিংবা আমার স্থলবর্তী কোনো মোতোয়াল্লির ওজর আপত্তি চলবে না।
কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, ১লা জুলাই ২০০২ সালে চুক্তি সম্পাদনের সময় ৭৫ টাকা মূল্যমানের দুটি স্ট্যাম্প ব্যবহার করা হয়। যার নম্বর যথাক্রমে ঙ৮৫০৬৩৯৭ এবং ঙ৮৫০৬৩৯৮। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওই সিরিয়ালের স্ট্যাম্প চট্টগ্রাম ট্রেজারি থেকে সরবরাহ করা হয় ৩১শে মে ২০০৫ সালে। সুতরাং প্রথম চুক্তিনামা সম্পাদন করা হয় ২০০৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে।   
ডা. জামান আরো জানান, আবদুল কুদ্দুস ২০০৫ সালের ২রা জুলাই ৫ বছরের জন্য আরেকটি ইজারা চুক্তি নবায়ন করেন এলেম উদ্দিনের সঙ্গে। এতে ভাড়া পূর্বের চুক্তিমতে এক হাজার ৫০০ টাকা। একই ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালের ১লা জুলাই আরও একটি ইজারা চুক্তিপত্র সম্পাদন করেন। এতে মাসিক ভাড়া ধরা হয় ২ হাজার টাকা।
দেখা যায়, এলেম উদ্দিন তিনবার আবদুল কুদ্দুসের সঙ্গে চুক্তি করলেও একবারও ভাড়া নেননি। রিলায়েন্স ফুড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভাড়া নেয়া হয় রসিদের মাধ্যমে। কিন্তু এ নামে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। আবার একই জায়গা আমীর হামজার কাছেও ইজারা দেওয়া হয় ১৯৮৫ সালে।
অন্যদিকে জায়গাটি আবদুল কুদ্দুস দখলে রেখে হোটেল জামান অ্যান্ড বিরানী হাউজের কাছেও ভাড়া দেন। হোটেল জামান কর্তৃপক্ষকে আমমোক্তারনামা দেন আবদুল কুদ্দুস। সে হিসেবে হোটেল জামান কর্তৃপক্ষ মোতোয়াল্লি ডা. জামান আহম্মদের বিরুদ্ধে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মিস মামলা করেন। এতে ঘটনাস্থল লিখা হয় বন্দর থানাধীন। কিন্তু ঘটনাটি ইপিজেড এলাকায়।
সরজমিনে দেখা যায়, ইপিজেড এলাকার এ জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে চারতলা ভবন। ভবনের নিচ তলায় আল ইদ্রিস ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, দ্বিতীয়-তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় হোটেল জামান অ্যান্ড বিরানি হাউস। এক্ষেত্রে আরও একটি ভাড়ানামা চুক্তিপত্রে প্রথমপক্ষ করা হয় এলেম উদ্দিনকে। দ্বিতীয় পক্ষ আবদুল কুদ্দুস, খুরশিদা বেগম ও রোকেয়া বেগমকে। আর খুরশিদা বেগম হচ্ছেন আমমোক্তার নামা গ্রহণকারী জামশেদ রুবেলের মা। কিন্তু রোটারি করা ওই চুক্তিপত্রের কোথাও তারিখ ও সাক্ষী নেই। এমনকি হোটেল জামান অ্যান্ড বিরিয়ানি হাউস কোনো ভাড়াও দেয়নি ওয়াকফ এস্টেটকে।
এ বিষয়ে জামশেদ রুবেল বলেন, হোটেল জামানের সঙ্গে আবদুল কুদ্দুসের চুক্তিনামা রয়েছে। ওয়াকফ এস্টেটের সঙ্গেও চুক্তিনামা থাকার কথা জানান। এক জায়াগার ভাড়া চুক্তিনামা দুজনের সঙ্গে কেন জানতে চাইলে তিনি তা এড়িয়ে যান।   
এ বিষয়ে কথা হয় আবদুল কুদ্দুসের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমি খালি জায়গা ভাড়া নিয়ে ভবন নির্মাণ করেছি। এতে আমার অনেক টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু বর্তমান মোতোয়াল্লী আমার সাথে আপসে আসছে না। তাই আমি কোর্টে ভাড়া জমা দিচ্ছি এবং আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত জায়গার ওপর স্থিতিবস্থা জারি করেছেন। এ ব্যাপারে সাবেক মোতোয়াল্লি এলেম উদ্দিন বলেন, আমাকে তারা ব্যবহার করেছেন। আমি কখন কী করেছি মনে নেই। আমি কোনো আর্থিক সুবিধা নেইনি। আবদুল কুদ্দুসকে খালি জায়গা ভাড়া দিয়েছি। কুদ্দুস ওখানে কত কী করেছেন আমি জানি না।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন