দুদকে মামলা, উচ্ছেদে নামছে প্রশাসন

জগন্নাথপুরে জাল দলিলে ভূমি দখল করে বাজার, তোলপাড়

শেষের পাতা

ওয়েছ খছরু, সিলেট থেকে | ১৩ জানুয়ারি ২০১৮, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:২৮
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে ‘বাজার স্থাপন’ নিয়ে জালিয়াতির ঘটনায় তোলপাড় চলছে। ওই গ্রামের সিদ্দিকুর রহমান নামের এক ব্যক্তি অন্যের নামে বন্দোবস্তকৃত ১ একর ভূমিতে  ওই বাজার স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। নামকরণ করেছিলেন ‘নলুয়ার বাজার’। কিন্তু জমির কাগজ জালিয়াতির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় বাজার স্থাপনের কোনো প্রশাসনিক অনুমতি দেয়া হয়নি। এরপরও ভিটে বিক্রির মাধ্যমে এরই মধ্যে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে প্রায় দেড় কোটি টাকা। আর ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে উচ্চ আদালতে রিট করার কারণে তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা।
 
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সুনামগঞ্জের নলুয়া হাওরের তীরবর্তী গ্রাম ভুরাখালী। চতুর্দিকে হাওর বেষ্টিত এ গ্রামের অধিকাংশ মানুষ নিম্ন আয়ের হওয়ার কারণে এখানে বাজারের কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই বলে জানিয়েছেন তারা।  
ভুরাখালীর পার্শ্ববর্তী চিরাউড়া গ্রামের নুর আলী কয়েক বছর আগে নিজেকে ভূমিহীন দেখিয়ে সরকার থেকে এক একর ভূমি নিজের নামে বন্দোবস্ত নেন। তবে, ভূমিটি গোচারণ ভূমি ও শিশুদের খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহার করতো স্থানীয়রা। জীবিত থাকা অবস্থায় এতে নুর আলীও কখনো কোনো আপত্তি করেননি। নুর আলীর মৃত্যুর পর পাশের গ্রাম ভুরাখালীর সিদ্দিকুর রহমান ওই ভূমির কাগজপত্র জালিয়াতি করে নিজের নামে করে নেন। একই সঙ্গে ওই ভুয়া দলিলে গ্রামের লন্ডনপ্রবাসীসহ আরো চার জনকে সম্পৃক্ত করা হয়। দলিল সম্পাদন করে সিদ্দিকুর রহমান এক একর ভুমিতে ৮০টি দোকান কোটা নির্মাণ করে ৭৬টি কোটা বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। প্রতিটি দোকান কোটা বিক্রি করা হয় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা দরে। পাশাপাশি বাজার দেখিয়ে ইউনিয়ন অফিস থেকে বরাদ্দও নেয়া হয়। কিন্তু গ্রামের মানুষ জাল কাগজে বাজার করা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কয়েকজন লন্ডন প্রবাসী টাকা দিয়ে বাজার স্থাপনের প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু জালিয়াতির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় তারাও সরে গেছেন।
সিদ্দিকুর রহমানের লুটপাট ও জালিয়াতির মাধ্যমে জমি দখলের ঘটনায় গ্রামের নুরুল হকসহ ১২ ব্যক্তি ২০১৬ সালের ৬ই জানুয়ারি জগন্নাথপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর আবেদন করেন। ওই আবেদনে তারা বাজারের প্রতিষ্ঠাতা দাবিদার সিদ্দিকুর রহমান জাল কাগজের মাধ্যমে জমি দখল করে বাজারের নামে লুটপাটের অভিযোগ করেন। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবেদনকারী ১২ জন ও  অভিযুক্ত সিদ্দিকুর রহমানের বিরুদ্ধে নোটিশ জারি করেন। ওই নোটিশে জগন্নাথপুরের ইউএনও কার্যালয়ে এসে শুনানিতে অংশ নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু ওই শুনানিতে অভিযোগকারীরা অংশ নিলেও সিদ্দিকুর রহমান হাজির না হয়ে নতুন বাজারের অনুমতি চেয়ে ওই বছরের ১৪ই জানুয়ারি সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন। জেলা প্রশাসক তার আবেদনটি গ্রহণ করে জগন্নাথপুরের ইউএনওকে পাঠিয়ে কাগজ পর্যবেক্ষণ পূর্বক বিবেচনার নির্দেশ দেন। এই অবস্থায় ইউএনও বিষয়টির সার্বিক তদন্ত করার জন্য উপজেলা ভূমি কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন। ভূমি কর্মকর্তার তদন্ত শুরুর প্রাক্কালেই সিদ্দিকুর রহমান উচ্চ আদালতে চলে যান। তিনি বাজার স্থাপনের জন্য হাইকোর্টের শরণাপন্ন হন। উচ্চ আদালতে রিট আবেদন দাখিলের পরপরই আদালত ওই ভূমির বাজার উচ্ছেদ কিংবা দখলের উপর ছয় মাসের নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। পাশাপাশি কেনো বাজার করা যাবে না- মর্মে রুল জারি করেন।
উচ্চ আদালতের নির্দেশের পর উপজেলা প্রশাসন নীরব হয়ে পড়লেও নিজের রিটের স্থগিতাদেশ ভঙ্গ করে বাজার স্থাপনের কাজ চালান সিদ্দিকুর রহমান। এমনকি তিনি কয়েকটি ঘরও নির্মাণ করে ফেলেন। এই অবস্থায় জগন্নাথপুরের ভূমি কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার ২০১৬ সালে ৮ই মে হাইকোর্টের নোটিশের জবাব দাখিল করেন। জবাবে তিনি উল্লেখ করেন- সিদ্দিকুর রহমান জাল দলিল সম্পাদন করে ভূমির মালিক সেজে বেআইনিভাবে বাজার স্থাপনের প্রক্রিয়া চালাচ্ছেন। এদিকে, হাইকোর্টে ওই রিটের শুনানিতে অতিরিক্ত পক্ষ হিসেবেও অংশ নেন গ্রামের অভিযোগকারী ১২ জনের মধ্যে ৭ জন। তারা পক্ষ নেয়ার পর আদালতে ভূমি কর্মকর্তার রিপোর্টসহ কাগজপত্র পর্যবেক্ষণ করেন। এর প্রেক্ষিতে গত বছরের ১৪ই জুন হাইকোর্ট রিট পিটিশন মামলা খারিজ করে দেন। ফলে হাইকোর্ট থেকে বাজারের বৈধতা নিতে পারেননি সিদ্দিকুর রহমান। পাশাপাশি ২০১৬ সালের ১৬ই আগস্ট জাল কাগপত্র সৃজন করার দায়ে ভূমিহীন নুর আলীর নামের লিজ বাতিল করে দেন সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক। ফলে ভূমিটি পুনরায় সরকারি খতিয়ানে চলে যায়। এদিকে, ভূমি আত্মসাতের জন্য জাল কাগজপত্র সৃজন করায় ২০১৬ সালের ২৩শে মে জগন্নাথপুরের ইউনিয়ন তফশিল কর্মকর্তা নুর আলী জগন্নাথপু থানায় সিদ্দিকুর রহমান ও তার ভাই সৈয়দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। মামলাটি তদন্তের জন্য দুদকে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে দুদক ওই মামলার তদন্ত করছে।
এ ব্যাপারে বাজারের উদ্যোক্তা সিদ্দিকুর রহমান জানিয়েছেন, বাজারের বৈধতা যেমন নেই, তেমন বাজারটি অবৈধও নয়। দীর্ঘদিন ধরে এখানে বাজার বসছে। স্থানীয় মানুষের চাহিদার কারণে এখানে বাজার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে ৭৯টি প্লট বিক্রি করা হয়েছে। প্লট বিক্রির টাকা থেকে মামলার খরচ বাবদ প্রায় ৭৯ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। বাজারের জন্য আগামী কিছুদিনের মধ্যে জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করা হবে বলে জানান তিনি। হাইকোর্টের রিট করার পর সেটি তারা নিজ থেকেই তুলে নিয়ে এসেছেন বলে জানান সিদ্দিকুর রহমান।
জগন্নাথপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুম বিল্লাহ গতকাল জানিয়েছেন, হাইকোর্টে রিট খারিজের পর আমি দুই দফা পুলিশ নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু লোকবল কম থাকায় উচ্ছেদ করা যায়নি। তিনি বলেন, এতদিন বিষয়টি হাইকোর্টের এখতিয়ারে থাকায় সেটি করা যায়নি। জেলা প্রশাসক মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনাক্রমে ওই এলাকার স্থাপনা উচ্ছেদে অতিরিক্ত লোকবল নিয়ে অভিযান চালানোর প্রস্তুতি চলছে বলে জানান।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

শাজিদ

২০১৮-০১-১২ ১১:২৭:৩৯

ক্ষমতা খাটিয়ে খুন গুম এবং পুলিশের ভয় দেখাইয়া সাধারণ মানুষের জাগা জমি দখল করে সাধারণ বাজার বিলাশ বহুল মার্কেট বানাইয়া এবং প্লট বানাইয়া অন্যের কাছে বিক্রয় করে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছে তাদের ব্যপারে আইনের আশ্রয় নেয়াটা বোকামি নয় কি? কারণ এরা তো নিজেরাই আইন আদালত হয়ে অন্যের জাগা জমি দখল করেছে।

আপনার মতামত দিন

কলেজে এসকেলেটর বিলাস, ৪৫৪ কোটি টাকার প্রকল্প

ইইউয়ে পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে বাংলাদেশ

ফাইনালে বাংলাদেশ হাথুরুকেও জবাব

আইভীর অবস্থা স্থিতিশীল, দেখতে গেলেন কাদের

শামীম ওসমানের বক্তব্যে তোলপাড় নানা প্রশ্ন

বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ‘সভাপতি হলে তুই মাত করে দিবি’

চট্টগ্রামে বেপরোয়া অর্ধশত কিশোর গ্যাং

তুরাগতীরে লাখো মুসল্লির জুমার নামাজ আদায়

দু’দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা

পিয়াজের কেজি এখনো ৬৫-৭০ টাকা

নির্বাচন চাইলে সরকার আপিল বিভাগে যেতো

‘বাংলাদেশ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে’

‘শাসকগোষ্ঠীর নির্মম শিকলে বন্দি মানুষ’

ফেনীতে সাড়ে ১৩ হাজার ইয়াবাসহ আটক ১

ছেলেকে হত্যার পর মায়ের স্বীকারোক্তি

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী নিখোঁজ